শ্রীপুর(গাজীপুর)প্রতিনিধি: ভোর হতেই উনুনে আগুন জ্বলে উঠেছিল। আর নয়টা সাধারণ সকালের মতোই রান্নাঘরের ধোঁয়া আর চাল ফোটার গন্ধ জানান দিচ্ছিল এক চিলতে সংসারের রোজকার গল্পের। গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার বেড়াদেচালা গ্রামের জসীমউদ্দীনের ঘরে তখনো কেউ জানত না, এই সকালটাই তাদের জীবনের সব আলো কেড়ে নিতে আসছে। সকাল ৯টার দিকে যখন রান্নাঘরে বসে খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ৪০ বছর বয়সী গৃহবধূ কোহিনুর বেগম, ঠিক তখনই মুহূর্তের এক আকস্মিক বিপর্যয় স্তব্ধ করে দিল সবকিছু।
পাশের বাড়ির একটি পুরোনো মাটির দেয়াল ধসে পড়ার বিকট শব্দ, আর তার পর পরই চিরতরে নীরব হয়ে যাওয়া একটি কণ্ঠ নিমেষেই একটি হাসিখুশি পরিবারকে ভাসিয়ে দিল অনন্ত কান্নায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ আর মাটির চাপ সরাবার আকুল চেষ্টা সবই শুরু হয়েছিল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। প্রতিবেশী জয়নালের একটি জরাজীর্ণ, জীর্ণপ্রায় মাটির দেয়াল ভাঙছিল কয়েকজন শ্রমিক। কিন্তু কোনো এক অসাবধানতায় কিংবা ভুলের মাশুল দিতে হলো জসীমউদ্দীনের পরিবারকে। দেয়ালটি ভেঙে সোজা গিয়ে পড়ে কোহিনুরের সাধের রান্নাঘরটির ওপর।
মাটির বিশাল স্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় পুরো রান্নাঘর, থালাবাসন আর খোদ কোহিনুর বেগম। প্রতিবেশীরা ছুটে এসে যখন মাটি সরিয়ে তাকে উদ্ধার করেন, ততক্ষণে তার শরীর নিস্তেজ। সকাল ১০টার দিকে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মোসা. মাইশা তাকে মৃত ঘোষণা করে বলেন, "হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ওনার প্রাণস্পন্দন থেমে গিয়েছিল।"হাসপাতালের করিডোরে যখন কোহিনুরের নিথর দেহ পড়ে আছে, তখন ক্ষোভে, দুঃখে আর অপমানে ফেটে পড়ছিলেন স্বামী জসীমউদ্দীন। তার অভিযোগের আঙুল প্রতিবেশী জয়নালের দিকে।চোখের জল মুছতে মুছতে জসীমউদ্দীন বলেন:
"ওরা জানত আমার স্ত্রী ভেতরে রান্না করছে। জেনেশুনেই জয়নাল আর তার লেবাররা ওই ভারী দেয়ালটা আমার রান্নাঘরের ওপর ফেলে দিয়েছে। এটা কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে না। এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড! আমি আমার স্ত্রীর এই নির্মম মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার চাই।"
একটি পুরোনো দেয়াল ভাঙার সময় কেন ন্যূনতম নিরাপত্তার কথা ভাবা হলো না? কেন পাশের বাড়ির মানুষের জীবনের ঝুঁকিকে তোয়াক্কা না করে এভাবে দেয়ালটি ফেলা হলো?জসীমউদ্দীনের এই প্রশ্ন এখন পুরো বেড়াদেচালা গ্রামের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। ঘটনার পর পরই শ্রীপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করছে। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম জানান:
"খবর পেয়েই আমরা পুলিশ পাঠিয়েছি। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি নিছক দেয়াল ধসের দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে কোনো অবহেলা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। অপরাধী যেই হোক, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"দুপুরের সূর্য যখন মাথার ওপর, জসীমউদ্দীনের বাড়ির রান্নাঘরের উনুন ততক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কিন্তু কোহিনুর বেগমের আকস্মিক ও মর্মান্তিক চলে যাওয়া যে শূন্যতা তৈরি করল, তা এই পরিবারের বুকে আজীবন জ্বলতে থাকবে।
শ্রীপুর(গাজীপুর)প্রতিনিধি:
