কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: মীর রকিবুল ইসলাম
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে দুই শিশুকে হয়রানি, টানাটানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ১৪ বছরের এক কিশোরকে আসামি করার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে। এজাহারে কিশোরটির বয়স ১৬ বছর উল্লেখ করা হলেও সরেজমিন অনুসন্ধানে তার বয়স ১৪ বছর বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে ঘটনার সময় সে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার দূরে কুষ্টিয়া বড়বাজার এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করছিল বলে দাবি করেছে তার পরিবার ও কর্মস্থলের লোকজন। এ ঘটনায় কুমারখালী থানায় মোঃ রাজু হোসেন বাদী হয়ে মোঃ ইয়াসিন আলী (১৬) ও মোঃ আরাফাত হোসেন (২০) নামে দুইজনের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করেন। এজাহারে বলা হয়, গত ২১ জুলাই বিকেলে প্রাইভেট পড়া শেষে বাড়ি ফেরার পথে বাদীর ৭ বছর বয়সী মেয়ে জামেলা খাতুন ও তার ৯ বছর বয়সী ভাতিজি কয়া মধ্যপাড়া মসজিদের কাছে পৌঁছালে আসামিরা তাদের কাছে যায়। একপর্যায়ে ইয়াসিন শিশুটিকে হয়রানি ও শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে এবং অপর আসামি আরাফাত তার সহযোগিতা করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, শিশুটির সঙ্গে থাকা ভাতিজি তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তাকেও আঘাত ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। একপর্যায়ে শিশুটি চিৎকার করলে ইয়াসিনের হাতে থাকা জ্বলন্ত সিগারেট মুখে চেপে ধরে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে অভিযোগে উল্লেখ করা ইয়াসিনের বয়স ও ঘটনার সময় তার অবস্থান নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ইয়াসিনের পরিবারের দাবি, তার বয়স ১৪ বছর। ঘটনার দিন সে কুষ্টিয়া বড়বাজার এলাকায় রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করছিল। ঘটনাস্থল থেকে ওই কর্মস্থলের দূরত্ব প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কাজ শেষ করে ইয়াসিন পারিশ্রমিক নিয়ে সহকর্মীর সঙ্গে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। ইয়াসিনের সঙ্গে সেদিন কাজ করা শ্রমিকদের কয়েকজনও জানান, তারা ওই দিন একসঙ্গে কাজ করেছেন এবং বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কাজ শেষ করেন। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারও জানান, তিনি সন্ধ্যা ৬টার দিকে শ্রমিকদের পারিশ্রমিক প্রদান করেন এবং ইয়াসিন তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যায়। ইয়াসিনের পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য যাচাই না করেই শুধু ইয়াসিন নামের ভিত্তিতে তাকে শনাক্ত করা হয়। পরে পরদিন ভোরে ১৫-২০ জন লোক তাদের বাড়িতে গিয়ে ঘুমন্ত ইয়াসিনকে ধরে নিয়ে যায় এবং মারধর করে বলে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন।
পরিবারের আরও অভিযোগ, ইয়াসিনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় তার মা-বাবা ও বোনও বিষয়টি জানতে চাইলে তাদের সঙ্গে অসদাচরণ ও মারধর করা হয়। পরে ইয়াসিনকে বাদী পক্ষের বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে প্রচন্ড মারধর ও মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। এদিকে ঘটনার বিষয়ে শিশুটির পরিবারের বক্তব্যেও ইয়াসিনের পরিচয় নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে। শিশুটির মা জানান, তার মেয়ে প্রাইভেট পড়া শেষে বাড়ি ফেরার সময় দুই কিশোর তার হাত ধরে টানাটানি করছিল। সঙ্গে থাকা আরেক শিশুটি তাকে সহযোগিতা করায় তারা তার মেয়েকে নিয়ে যেতে পারেনি। এ সময় একজন কিশোর অপরজনকে দ্রুত চলে যেতে বলেছিল বলে তিনি জানান। তবে ঘটনার সময় সেখানে থাকা ওই দুই কিশোরের পরিচয় কী ছিল এবং তাদের মধ্যে ইয়াসিন আদৌ ছিলেন কি না এ বিষয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এজাহারে ইয়াসিনের বয়স ১৬ বছর উল্লেখ করা হলেও তার পরিবারের দাবি, তার প্রকৃত বয়স ১৪ বছর। একই সঙ্গে ঘটনার নির্ধারিত সময় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী ঘটনাটি বিকেল আনুমানিক ৪টা ৩০ মিনিট থেকে ৫টার মধ্যে ঘটে। অন্যদিকে ইয়াসিনের পরিবার, সহকর্মী ও ঠিকাদারের বক্তব্য অনুযায়ী, সে ওই সময় কুষ্টিয়া বড়বাজারে রাজমিস্ত্রির কাজে ছিল এবং বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার পর পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করছিল। ফলে ইয়াসিনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তার বয়স, ঘটনার সময় তার অবস্থান, কর্মস্থলের দূরত্ব এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে শিশুটির ওপর হয়রানি বা নির্যাতনের অভিযোগটি সত্য হলে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে কোনো নিরপরাধ কিশোর যেন শুধু নামের মিল বা অনুমানের ভিত্তিতে হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়েও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে কুমারখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জামাল উদ্দিন জানান, ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত কিশোর নিজেই তার অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।