শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আজ বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা শাম্মী কাপুরের মৃত্যুবার্ষিকী

আজ বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা শাম্মী কাপুরের মৃত্যুবার্ষিকী

আজ বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা শাম্মী কাপুরের মৃত্যুবার্ষিকী

Yahoo!... চাহে কোই মুঝে জংলি কহে!” 🎶
এই একটি উচ্ছ্বাসই যেন একসময় গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের সিনেমাপ্রেমীদের হৃদয়ে এক বিশেষ নায়কের নামকে স্থায়ী করে দিয়েছিল—শাম্মী কাপুর। ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের এই কিংবদন্তি অভিনেতা ছিলেন প্রচলিত নায়কোচিত অভিনয়ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত এক প্রাণবন্ত, দুরন্ত ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব।

 

তিনি শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি স্টাইল, একটি যুগ, একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা। তাঁর অদম্য প্রাণশক্তি, দুষ্টুমি মেশানো হাসি, শরীরী অভিনয়, অভিনব নাচের ভঙ্গি এবং পর্দায় বিস্ফোরক উপস্থিতি ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের হিন্দি সিনেমার নায়ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল। তাঁর নাচ ও স্টাইলের কারণে তাঁকে প্রায়ই “ভারতের এলভিস প্রিসলি” বলা হতো।

 

শাম্মী কাপুরের আসল নাম শমশের রাজ কাপুর (Shamsher Raj Kapoor)। তিনি ১৯৩১ সালের ২১ অক্টোবর তৎকালীন বোম্বেতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা ও নাট্যব্যক্তিত্ব পৃথ্বীরাজ কাপুরের সন্তান এবং বিখ্যাত কাপুর পরিবারের সদস্য। তাঁর ভাই ছিলেন রাজ কাপুর ও শশী কাপুর।

 

মুম্বাইয়ের রুইয়া কলেজে অল্প সময় পড়াশোনার পর তিনি বাবার প্রতিষ্ঠিত পৃথ্বী থিয়েটার্সে যোগ দেন। ১৯৪৮ সালে মাত্র ১৬-১৭ বছর বয়সে সেখানে জুনিয়র শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর নিজের জীবনীতে উল্লেখ আছে, শুরুতে তাঁর মাসিক বেতন ছিল ৫০ রুপি এবং ১৯৫২ সালে থিয়েটার ছাড়ার সময় তাঁর শেষ বেতন ছিল ৩০০ রুপি।

 

১৯৫৩ সালে ‘জীবন জ্যোতি’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক হয়। ছবিটির পরিচালক ছিলেন মহেশ কাউল এবং তাঁর বিপরীতে ছিলেন চান্দ উসমানি। কিন্তু শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। প্রথম দিকের বেশ কয়েকটি ছবি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। একসময় শাম্মী নিজেকেই মজা করে “male starlet” বলতেন।
তবে তিনি হাল ছাড়েননি।

 

১৯৫৭ সালের ‘তুমসা নেহি দেখা’ তাঁকে নতুন পরিচিতি দেয়। এরপর ‘দিল দেকে দেখো’ (১৯৫৯) তাঁর স্টাইলিশ, দুষ্টু-মিষ্টি ও নৃত্যনির্ভর নায়ক-ইমেজকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।

 

‘জংলি’ এবং ‘Yahoo’-এর বিস্ফোরণ
১৯৬১ সালের ‘জংলি’ ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের এক যুগান্তকারী মোড়। সায়রা বানুর অভিষেক-ছবিও ছিল এটি। ছবির গান “চাহে কোই মুঝে জংলি কহে” এবং তাঁর বিখ্যাত “Yahoo!” উচ্চারণ তাঁকে রাতারাতি তুমুল জনপ্রিয়তার শিখরে নিয়ে যায়।
শাম্মীর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি নাচকে শুধু গানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতেন না; নাচকেই চরিত্রের ভাষা বানিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর শরীরী অঙ্গভঙ্গি, মাথা দোলানো, লাফ, চোখের চাহনি এবং মুহূর্তের মধ্যে ভঙ্গি বদলে ফেলার ক্ষমতা ছিল সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব। তাঁর এই অভিনব স্টাইলই তাঁকে সমকালীন অন্য নায়কদের থেকে আলাদা করে দেয়।

 

একের পর এক কালজয়ী ছবি-
ষাটের দশকে শাম্মী কাপুর হয়ে ওঠেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে—
Tumsa Nahin Dekha
Dil Deke Dekho
Junglee
Professor
Dil Tera Deewana
China Town
Rajkumar
Kashmir Ki Kali
Janwar
Teesri Manzil
An Evening in Paris
Brahmachari
Prince
এই ছবিগুলোতে কখনও তিনি দুরন্ত প্রেমিক, কখনও দুষ্টু যুবক, কখনও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় নায়ক, আবার কখনও হাস্যরসাত্মক চরিত্রে দর্শকদের মাতিয়ে রেখেছেন। তাঁর সঙ্গে পর্দায় জুটি বেঁধেছিলেন সায়রা বানু, শর্মিলা ঠাকুর, আশা পারেখ, সাধনা-সহ তৎকালীন বহু জনপ্রিয় অভিনেত্রী।


‘ব্রহ্মচারী’ ও পুরস্কার-
১৯৬৮ সালের ‘ব্রহ্মচারী’ ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর পুরো চলচ্চিত্রজীবনে তিনি তিনটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন।
গীতা বালির সঙ্গে প্রেম ও বেদনাময় অধ্যায়-
১৯৫৫ সালে শাম্মী কাপুর বিয়ে করেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী গীতা বালিকে। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় দুই সন্তান—আদিত্য রাজ কাপুর ও কাঞ্চন কাপুর।


কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ শোক। ১৯৬৫ সালের ২১ জানুয়ারি গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে গীতা বালি মারা যান। তাঁর মৃত্যু শাম্মীর জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছিল।


পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে তিনি নীলা দেবীকে বিয়ে করেন। নীলা দেবী তাঁর সন্তানদেরও আপন করে নেন।  নায়ক থেকে চরিত্রাভিনেতা-
সময় বদলেছে, বয়স বেড়েছে—শাম্মী কাপুরও ধীরে ধীরে রোমান্টিক নায়কের ভূমিকা থেকে চরিত্রাভিনয়ের দিকে চলে যান। কিন্তু তাঁর অভিনয়ের প্রাণশক্তি কখনও হারিয়ে যায়নি।
পরবর্তী সময়ে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন এবং প্রমাণ করেন—একজন সত্যিকারের শিল্পীর বয়স হয়, কিন্তু শিল্পের মৃত্যু হয় না।

 

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি প্রযুক্তির প্রতিও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। তিনি ভারতের প্রাথমিক দিকের কম্পিউটার ও ইন্টারনেট-উৎসাহী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন এবং Internet Users Club of India-এর চেয়ারম্যানও ছিলেন।

 

২০১১ সালের ১৪ আগস্ট, মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ৭৯ বছর বয়সে শাম্মী কাপুর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতীয় সিনেমার এক দুরন্ত, উচ্ছল ও স্বতন্ত্র যুগের অবসান ঘটে।
কিন্তু কিংবদন্তিদের মৃত্যু হয় না।

 

আজও যখন পুরোনো পর্দায় শাম্মী কাপুরের চোখে সেই দুষ্টু ঝিলিক দেখা যায়, যখন তাঁর শরীরী ছন্দে গান জীবন্ত হয়ে ওঠে, যখন বরফঢাকা পাহাড়ে তাঁর কণ্ঠে ভেসে আসে—“Yahoo!...”
তখন মনে হয়, তিনি যেন এখনও সেই তরুণ, প্রাণচঞ্চল নায়ক—যিনি একদিন বলিউডকে শিখিয়েছিলেন, নায়ক মানেই শুধু গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা নয়; নায়ক হতে হলে আনন্দ, উন্মাদনা ও স্বাধীনতারও প্রয়োজন।

 

শাম্মী কাপুর—
একজন অভিনেতা নন শুধু,
একটি যুগের প্রতীক।
একটি অভিনয়শৈলীর নাম।
একটি চিরসবুজ স্মৃতি।
কিংবদন্তি অভিনেতা শাম্মী কাপুরের প্রয়াণবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।