ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের সাদামাটা, স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত অভিনয়ের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন বিদ্যা সিনহা। পর্দায় তাঁর মায়াময় হাসি, সংযত অভিব্যক্তি এবং সহজাত অভিনয়শৈলী তাঁকে সত্তরের দশকের দর্শকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় করে তুলেছিল। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত জীবনের সাধারণ নারী চরিত্রকে অসাধারণ স্বাভাবিকতায় ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন।
১৯৪৭ সালের ১৫ নভেম্বর তৎকালীন বোম্বেতে জন্মগ্রহণ করেন বিদ্যা সিনহা। তাঁর পিতা প্রতাপ এ. রানা, যিনি রানা প্রতাপ সিং নামেও পরিচিত ছিলেন, চলচ্চিত্র প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিদ্যা সিনহা মডেলিংয়ের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ‘মিস বোম্বে’ খেতাব অর্জন করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের হয়ে মডেলিং করতে গিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক বসু চট্টোপাধ্যায়ের নজরে আসেন।
১৯৭৪ সালে ‘রাজা কাকা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক হয়। ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন কিরণ কুমার। তবে একই বছর বসু চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘রজনীগন্ধা’ তাঁকে রাতারাতি পরিচিতি এনে দেয়।
স্বল্প বাজেটের এই ছবিটি প্রচলিত বাণিজ্যিক ছবির জাঁকজমক ছাড়াই দর্শক ও সমালোচকদের মন জয় করে। মধ্যবিত্ত জীবনের আবেগ, সম্পর্ক ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের সরল উপস্থাপনায় বিদ্যা সিনহার অভিনয় ছবিটির সাফল্যের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
এরপর ‘ছোটি সি বাত’ (১৯৭৬)-এ তাঁর অভিনয় তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। অমল পালেকরের সঙ্গে তাঁর জুটি হিন্দি সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় মধ্যবিত্ত রোমান্টিক জুটি হিসেবে দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিতি পায়।
সত্তরের দশকে তিনি একের পর এক উল্লেখযোগ্য ছবিতে অভিনয় করেন। এর মধ্যে রয়েছে—
রজনীগন্ধা (১৯৭৪)
ছোটি সি বাত (১৯৭৬)
কিতাব (১৯৭৭)
ইনকার (১৯৭৭)
মুক্তি (১৯৭৭)
কর্ম (১৯৭৭)
পতি পত্নী অউর ওহ (১৯৭৮)
মীরা (১৯৭৯)
কিরায়েদার (১৯৮৬)
বসু চট্টোপাধ্যায়, গুলজারসহ সে সময়ের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর অধিকাংশই ছিল জীবনের খুব কাছাকাছি—যেখানে অতিনাটকীয়তার বদলে আবেগ, সম্পর্ক ও মানবিকতার সূক্ষ্ম প্রকাশই ছিল মুখ্য।
ভিন্নধর্মী চরিত্রেও বিদ্যা-
বিদ্যা সিনহা শুধু কোমল ও রোমান্টিক চরিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। রাজ সিপ্পি পরিচালিত ‘জোশ’ (১৯৮১) চলচ্চিত্রে তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম ব্যতিক্রমী চরিত্রে অভিনয় করেন। এখানে তাঁকে নেতিবাচক চরিত্রে দেখা যায়—যা তাঁর স্বাভাবিক পর্দা-ইমেজের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।
একই সময়ে ‘লাভ স্টোরি’ (১৯৮১)-তেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন।
প্রায় এক দশকের চলচ্চিত্রজীবনে তিনি প্রায় ৩০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ব্যক্তিগত কারণে অভিনয় থেকে দীর্ঘ বিরতি নেন এবং কিছু সময় অস্ট্রেলিয়াতেও বসবাস করেন।
ছোট পর্দায় নতুন অধ্যায়-
দীর্ঘ বিরতির পর নতুন শতাব্দীতে বিদ্যা সিনহা আবার অভিনয়ে ফিরে আসেন। এবার তাঁর কর্মক্ষেত্র হয়ে ওঠে টেলিভিশন। একের পর এক জনপ্রিয় হিন্দি ধারাবাহিকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য টেলিভিশন ধারাবাহিকের মধ্যে রয়েছে—
- বাহু রানি
- কাব্যাঞ্জলি
- ভাবী
- হার জিত
- কুবুল হ্যায়
- ইত্তি সি খুশি
- চন্দ্র নন্দিনী
- কুলফি কুমার বাজেওয়ালা
বিশেষ করে ‘কুবুল হ্যায়’ ধারাবাহিকে ‘বড়ি বি’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধারাবাহিকে তিনি মা, ঠাকুমা ও পরিবারের প্রবীণ সদস্যের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয়জীবনের নতুন পরিচয় তৈরি করেন।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০১১ সালে তিনি সালমান খান অভিনীত ‘বডিগার্ড’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আবার বড় পর্দায় ফিরে আসেন। এটিই ছিল তাঁর অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র।
২০১৯ সালের ১৫ আগস্ট, ৭১ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে বিদ্যা সিনহার জীবনাবসান ঘটে। ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন।
একজন মডেল হিসেবে যাত্রা শুরু করে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকা এবং পরবর্তীকালে টেলিভিশনের পরিচিত মুখ—দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বিদ্যা সিনহা নিজেকে বারবার নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।
তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল স্বাভাবিকতা। পর্দায় তিনি কখনো কৃত্রিম বা অতিনাটকীয় হয়ে ওঠেননি; বরং সাধারণ মানুষের জীবনের আবেগ, ভালোবাসা, সম্পর্ক ও অনুভূতিকে অত্যন্ত সহজভাবে তুলে ধরেছেন। তাই ‘রজনীগন্ধা’ বা ‘ছোটি সি বাত’-এর মতো চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো আজও দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত।
সাদামাটা অথচ অসাধারণ অভিনয়ের সেই মায়াবী শিল্পী বিদ্যা সিনহা আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্র, তাঁর স্বতন্ত্র হাসি এবং তাঁর অনাড়ম্বর অভিনয়শৈলী ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মৃত্যুবার্ষিকীতে অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহার স্মৃতির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।
তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।