পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা ইউনিয়নের ধাইজান গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে থাকা জমিতে আদালতের লাল পতাকা টাঙিয়ে রোপণ করা ধানের চারা তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে জমির দখল অন্য পক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়ায় মালিকানা ও দখল নিয়ে নতুন করে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. হাসিবুল ইসলাম (৫০) দাবি করেন, তাঁর পরিবার প্রায় ৬৫ বছর ধরে ওই জমি ভোগদখল করে আসছে। গত ১০ আগস্ট তিনি পারিবারিক কাজে পঞ্চগড়ে অবস্থানকালে তাঁর অনুপস্থিতিতে জমিতে লাল পতাকা টাঙানো হয় এবং সেখানে রোপণ করা ধানের চারা তুলে দেওয়া হয়। পরে মো. আশরাফুল ইসলামের কাছে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হাসিবুল ইসলামের দাবি, এ বিষয়ে তাঁকে আগে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়ে থাকলেও আদালতের কার্যক্রম বা রায় সম্পর্কেও তাঁকে অবহিত করা হয়নি। তাঁর অনুপস্থিতিতে জমির দখল পরিবর্তনের ঘটনায় তিনি ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে জানান।
বিরোধপূর্ণ জমিটি তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা ইউনিয়নের ধাইজান গ্রামের সিপাইপাড়া মৌজায় অবস্থিত। জমির তফসিল অনুযায়ী মৌজা সিপাইপাড়া, জেএল নম্বর-২, সিএস খতিয়ান নম্বর-সিট ৫/২০৮, এসএ খতিয়ান নম্বর-১৫২, হাল খতিয়ান নম্বর-২২৪৪ এবং আরএস ডিবি নম্বর-১২৬৩-এর ৪১৭ ও ৪৭৪ নম্বর দাগের জমি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
হাসিবুল ইসলামের ভাষ্য, তাঁর মরহুম দাদা তমিরউদ্দীন ১৯৬৩ সালে তৎকালীন সিএস খতিয়ানের মালিক গোলাম মোস্তফা ও মকলেছার রহমানের কাছ থেকে ৬৩ শতক জমি ক্রয় করেন। পরে ১৯৮৬ সালে ওই বিক্রেতাদের বোন মোনোয়ারা খাতুনের কাছ থেকেও ২২৪৪ ও ১৯৪৪ নম্বর দাগে থাকা ১ দশমিক ৮৮ একর জমির মধ্য থেকে ৭৫ শতক জমি ক্রয় করা হয় বলে তিনি দাবি করেন। এসব দলিলের ভিত্তিতে তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে জমিটি ভোগদখল ও চাষাবাদ করে আসছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজনও দীর্ঘদিন ধরে হাসিবুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের লোকজনকে ওই জমিতে চাষাবাদ করতে দেখে আসার কথা জানিয়েছেন। হাসিবুল ইসলামের বর্গাচাষি একই গ্রামের মো. জাহিদুল, তাঁর স্ত্রী রুমা ও রুকসানা বেগমও প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর ধরে ওই জমিতে চাষাবাদ করে আসছেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
স্থানীয় ৭৫ বছর বয়সী মো. আবু সালেক বলেন, “জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি, হাসিবুল মেম্বারের দাদা মরহুম তমিরউদ্দীন এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তান শামসুল হুদা মাস্টার ও তাঁর ভাইয়েরা দীর্ঘ ৬০ থেকে ৬৫ বছর ধরে এই জমি ভোগদখল করে আসছেন।”
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল খালেক (৫৫), মো. তবিবর (৪৫) এবং বাংলাবান্ধা ইউনিয়নের সাবেক ৬ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. জুমারউদ্দীন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে হাসিবুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের লোকজনকে ওই জমি ভোগদখল ও চাষাবাদ করতে দেখে আসছেন তাঁরা।
তবে জমির দখল নেওয়ার দাবিদার মো. আশরাফুল ইসলাম (৫৫), পিতা মৃত সৌখিন আলী, বলেন, তিনি ১৫৫ নম্বর খতিয়ানে বাটোয়ারা মামলা করেছিলেন এবং ২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ওই মামলায় ডিক্রি পেয়েছেন। তাঁর দাবি, ১৯৭১ সালের একটি দলিলও তাঁদের কাছে রয়েছে, যা তাঁর বাবা সম্পাদন করেছিলেন।
বিবাদীপক্ষ আদালতে উপস্থিত ছিল কি না জানতে চাইলে আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিবাদী আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাঁদের পক্ষে রায় হয়েছে। তবে আদালতের পক্ষ থেকে জমিতে লাল পতাকা টাঙানোর আগে বিবাদীকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান।
এদিকে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। এক পক্ষ দীর্ঘদিনের ভোগদখল, ক্রয় দলিল ও চাষাবাদের কথা বলছে; অন্য পক্ষ আদালতের ডিক্রির ভিত্তিতে জমির দখল পাওয়ার দাবি করছে। ফলে জমির প্রকৃত মালিকানা ও আইনগত দখল নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র, খতিয়ান, রেকর্ড ও আদালতের নথি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
হাসিবুল ইসলাম বলেন, “আমি কোনো নোটিশ না পেয়েই আমার দীর্ঘদিনের দখলীয় জমিতে লাল পতাকা টাঙানো এবং ধানের চারা তুলে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আদালতের কোনো মামলা বা রায়ের বিষয়ে আগে আমাকে জানানো হয়নি। আমি চাই, সব পক্ষের দলিলপত্র, খতিয়ান, রেকর্ড ও দীর্ঘদিনের দখল যাচাই করে প্রকৃত বিষয়টি তদন্ত করা হোক।”
তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি জমির প্রকৃত মালিকানা ও আইনগত দখল নির্ধারণে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
মো. মাহাবুব আলম
জেলা প্রতিনিধি পঞ্চগড়