এই নামটার সাথে আমরা বেশিরভাগ মানুষই পরিচিত হয়েছি তার রচিত ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস পড়ার মাধ্যমে। নবম-দশম শ্রেণিতে এই উপন্যাসটি আমাদের অনেকেরই পাঠ্য বিষয় ছিল। কিন্তু তিনি কেবলই একজন ঔপন্যাসিক নন। তিনি একাধারে ছিলেন একজন সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং প্রযোজক।
জহির রায়হানের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে। বাবা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ এবং মা সৈয়দা সুফিয়া খাতুনের আট সন্তানের পরিবারে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তার প্রকৃত নাম আবু আবদাল মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ এবং ডাকনাম জাফর। বাবার কলকাতার এক আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতার কারণে তিনি পরিবার সহ কলকাতায় থাকতেন। এরপর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তারা সপরিবারে ঢাকায় ফিরে আসেন।
কলকাতায় ক্লাস ফোর-ফাইভে পড়ার সময় বড় ভাইয়ের প্রভাবে জহির রায়হান প্রথম রাজনৈতিক সংস্পর্শে আসেন। এসময় তিনি কলকাতায় রাস্তায় রাস্তায় ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকা বিক্রি করতেন কমিউনিস্ট পার্টির জন্য। ছোটবেলা থেকেই তার বই পড়া ও লেখালেখির অনেক শখ ছিল। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি যখন হাইস্কুলের ছাত্র, তখন ‘চতুষ্কোণ’ পত্রিকায় ‘ওদের জানিয়ে দাও’ নামে প্রথম তার একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এটি অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
জহির রায়হান ব্যক্তিজীবনে দু’বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবী। তারা ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন। প্রথম পরিবারে অনল রায়হান এবং বিপুল রায়হান নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। দ্বিতীয় পরিবারে রয়েছেন তার দুই সন্তান অপু ও তপু। তার বড় ভাই প্রয়াত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সার। তিনি জনপ্রিয় অভিনেত্রী শমী কায়সারের বাবা।
তার সাহিত্য রচনাগুলো ছিল জীবনমুখী। তার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে। এ উপন্যাসে গ্রামের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রাকে তিনি অসম্ভব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়া শহুরে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন তার আরেক উপন্যাস ‘বরফ গলা নদীর’ মাধ্যমে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি রচনা করেন ‘আরেক ফাল্গুন’ এবং ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামের দুটি উপন্যাস।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নিয়ে পড়াশোনাকালীন তিনি ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন বিভিন্ন নাট্য কর্মশালার সাথেও সরাসরি যুক্ত ছিলেন। সিনেমার প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি কলকাতার এক ফিল্ম স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু অর্থাভাবে দশ মাসের কোর্স মাত্র ছ’মাস করেই তাকে দেশে ফিরতে হয়।
১৯৬১ সালে তার প্রথম সিনেমা ‘কখনো আসেনি’ এর মাধ্যমে। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ নির্মাণ করেন।
ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১৯৭০ সালে ‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এই সিনেমা দেখে মুগ্ধ হয়ে তখনকার বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিনহা প্রমুখ জহির রায়হানের বিপুল প্রশংসা করেন।.ভাষা আন্দোলন নিয়ে তার কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ রচনা করেন। তার তৈরীকৃত ভাষা আন্দোলন ভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’ সরাসরি বাঙালিদের উপর পাকিস্তানি সৈন্যের বর্বরতার চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি কলকাতায় চলে যান। বিভিন্ন স্থিরচিত্র ও চলচ্চিত্র তৈরির মাধ্যমে পৃথিবীব্যাপী তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রচারণা চালান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তার প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ পৃথিবীব্যাপী অনেক সাড়া ফেলে। এই প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিকতা সম্পর্কে বাইরের দেশগুলোর মানুষ জানতে পারে। এবং জহির রায়হান দেশের বাইরে অনেক পরিচিতি পেয়ে যান।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর ও রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। তখন তিনি নিখোঁজ ভাইকে খোঁজার অভিযান শুরু করেন। ১৯৭২ সালের ২৮শে জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান যে, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
আজ ছিলো তার ৯০তম জন্মদিন।