বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের একটি মাত্র চরিত্রই তাঁদের চিরস্মরণীয় করে রাখে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকা ও গায়িকা অঞ্জু ঘোষ তেমনই এক কিংবদন্তি নাম। বিশেষ করে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ চলচ্চিত্রের জোসনা চরিত্র তাঁকে যে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল, তার প্রভাব বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক-স্মৃতিতে আজও অমলিন।
মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে-
অঞ্জু ঘোষের জন্ম ফরিদপুরে এবং শৈশব-কৈশোরের বড় একটি সময় কেটেছে চট্টগ্রামে। ছোটবেলা থেকেই গান ও অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর বাবা-মাও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ পাওয়া যায়। ছোটবেলায় তিনি এসরাজও শিখেছিলেন; চট্টগ্রামের সংগীতশিল্পী মানবেন্দ্র বড়ুয়ার কাছে তাঁর সংগীতশিক্ষার কথাও তিনি নিজেই জানিয়েছেন।
কৈশোরেই মঞ্চ ও যাত্রার সঙ্গে যুক্ত হন অঞ্জু। ১৯৭২ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের মঞ্চনাটকে তিনি অভিনয় করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় মঞ্চস্থ বিভিন্ন নাটক ও যাত্রাপালায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের মধ্যে তাঁকে পরিচিত করে তোলে।
চলচ্চিত্রে অভিষেক-
অঞ্জু ঘোষ অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেছিলেন বলে তাঁর সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। তাঁর প্রথম অভিনীত চলচ্চিত্র ছিল তমিজ উদ্দিন রিজভী পরিচালিত ‘আশীর্বাদ’; তবে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া তাঁর প্রথম ছবি ছিল এফ কবীর চৌধুরী পরিচালিত ‘সওদাগর’, যা ১৯৮২ সালে মুক্তি পায়।
এরপর একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ঢালিউডের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা হয়ে ওঠেন।
‘বেদের মেয়ে জোসনা’ — যে ছবি বদলে দিয়েছিল ইতিহাস
১৯৮৯ সালে তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ চলচ্চিত্রে ইলিয়াস কাঞ্চনের বিপরীতে অভিনয় করেন অঞ্জু ঘোষ।
জোসনা চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে রাতারাতি দর্শকের হৃদয়ের অত্যন্ত পরিচিত মুখে পরিণত করে। ছবিটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অসাধারণ ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করে এবং আজও বাংলা সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় ও আলোচিত ছবি হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুধু অভিনয় নয়—‘ওরে ও বাঁশিওয়ালা’-সহ তাঁর কণ্ঠে জনপ্রিয় গানও তাঁকে দর্শক-শ্রোতার কাছে আলাদা পরিচিতি দেয়।
তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের শিল্পী
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অঞ্জু ঘোষ তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বলে তাঁর সাক্ষাৎকার ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—
- সওদাগর
- চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা
- বেদের মেয়ে জোসনা
- বড় ভালো লোক ছিল
- প্রাণ সজনী
- শঙ্খমালা
- আবে হায়াত
- রাজার মেয়ে পারুল
সহ আরও বহু চলচ্চিত্র।
বিশেষ করে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ শুধু অঞ্জু ঘোষের ক্যারিয়ারের নয়, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হয়ে আছে।
বাংলাদেশ থেকে কলকাতায়
১৯৯০-এর দশকের শেষদিকে অঞ্জু ঘোষ বাংলাদেশ ছেড়ে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর দেশ ছাড়ার নির্দিষ্ট কারণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা থাকলেও তিনি নিজে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি। কলকাতায় বসবাসের পাশাপাশি তিনি সেখানকার চলচ্চিত্র ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর ২০১৮ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এরপর ২০১৯ সালে ‘মধুর ক্যান্টিন’ চলচ্চিত্রে যোগমায়া চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন।
📰 নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ
২০১৯ সালের জুনে অঞ্জু ঘোষ ভারতের ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-তে যোগ দেন। সেই সময় তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয়। বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তিনি ভারতীয় নাগরিক; অঞ্জু ঘোষ নিজেও সে সময় নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে, একজন শিল্পী হিসেবে অঞ্জু ঘোষের দীর্ঘ অভিনয়জীবন ও দর্শকপ্রিয়তাই তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অঞ্জু ঘোষের শিল্পীসত্তা
একজন শিল্পীর জীবনে সময় বদলায়, দেশ বদলায়, দর্শকের রুচি বদলায়—কিন্তু কিছু চরিত্র ও কিছু গান মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায় বছরের পর বছর।
অঞ্জু ঘোষের ক্ষেত্রে সেই স্মৃতির কেন্দ্রে আজও রয়েছে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’।
তাঁকে পছন্দ করার কারণ যেমন দর্শকের ছিল, তেমনি তাঁর ব্যক্তিজীবন ও পেশাজীবন নিয়ে নানা আলোচনা ও সমালোচনাও হয়েছে। কিন্তু একজন শিল্পীর কয়েক দশকের সৃষ্টিশীল পথচলা, অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় এবং দর্শকের মনে তৈরি করা স্থায়ী জায়গাটিও তাঁর মূল্যায়নের অংশ।
রেকর্ড, জনপ্রিয়তা এবং দর্শকের স্মৃতিই শেষ পর্যন্ত একজন শিল্পীর কাজকে সময়ের কাছে পৌঁছে দেয়।
জন্মদিনে কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও গায়িকা অঞ্জু ঘোষের প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
শুভ জন্মদিন, অঞ্জু ঘোষ।
আপনার অভিনীত চরিত্র, আপনার কণ্ঠের গান এবং বাংলা চলচ্চিত্রে আপনার রেখে যাওয়া স্মৃতি বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা