বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নির্মাতা রয়েছেন, যাঁদের সৃষ্টি প্রজন্মের পর প্রজন্ম দর্শকের মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। তাঁদের নির্মিত চলচ্চিত্র কখনো হাসিয়েছে, কখনো কাঁদিয়েছে, আবার কখনো সমাজের অসংগতি ও মানুষের বিবেককে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের তেমনই একজন প্রতিভাবান ও জনপ্রিয় পরিচালক ছিলেন আজিজুর রহমান।
বিশেষ করে শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘ছুটির ঘণ্টা’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। মানুষের আবেগ, সামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষা, নৈতিকতা এবং মানবিক অনুভূতিকে চলচ্চিত্রের ভাষায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর ছিল নিজস্ব দক্ষতা।
জন্ম ও শৈশব
১৯৩৯ সালের ১০ অক্টোবর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাংলার সান্তাহার রেলওয়ে জংশন শহরের কলসা সাঁতাহার মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন আজিজুর রহমান। তাঁর পিতার নাম রুপচাঁন প্রামাণিক।
ছোটবেলা থেকেই শিল্প ও সৃজনশীলতার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তিনি স্থানীয় আহসানউল্লাহ ইনস্টিটিউট থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকার সিটি নাইট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে চারুকলা আর্ট ইনস্টিটিউটে বাণিজ্যিক শিল্পকলায় ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
চিত্রকলা ও দৃশ্যশিল্পের এই শিক্ষা পরবর্তী সময়ে তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সহায়তা করেছিল।
চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ
১৯৫৮ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশামের সহকারী হিসেবে ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে কাজ করার মধ্য দিয়ে আজিজুর রহমানের চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয়।
সহকারী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে নিজের সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় ও নির্মাণদক্ষতার পরিচয় দিয়ে তিনি স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সাইফুল মূলক বদিউজ্জামান’। ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকগাথাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা লোকঐতিহ্যকে চলচ্চিত্রের পর্দায় তুলে ধরেন।
‘ছুটির ঘণ্টা’ — যে চলচ্চিত্র আজও দর্শকের হৃদয়ে অমলিন
আজিজুর রহমানের নাম উচ্চারিত হলেই যে চলচ্চিত্রটির কথা প্রথম মনে আসে, সেটি হলো ‘ছুটির ঘণ্টা’।
১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। একটি বিদ্যালয়ের ছুটির পর বাথরুমে আটকে পড়া এক শিশুর মর্মান্তিক পরিণতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র দর্শকের মনে গভীর বেদনার সৃষ্টি করে।
শিশুটির অসহায়ত্ব, তাকে উদ্ধার করতে না পারার নির্মম বাস্তবতা এবং সময়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠা উৎকণ্ঠা—সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রটি হয়ে ওঠে এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা।
‘ছুটির ঘণ্টা’ কেবল একটি শিশুর করুণ পরিণতির কাহিনি নয়; এটি মানুষের অসতর্কতা, দায়িত্ববোধের অভাব এবং সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
চলচ্চিত্রটির আবেগঘন উপস্থাপনা দর্শককে যেমন কাঁদিয়েছে, তেমনই শিশুদের নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব সম্পর্কে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
সময়ের ব্যবধান সত্ত্বেও চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের আলোচনায় আজও বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।
‘অশিক্ষিত’ — শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার বার্তা
আজিজুর রহমান পরিচালিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ‘অশিক্ষিত’।
এই চলচ্চিত্রে শিক্ষার গুরুত্ব, নিরক্ষরতার সমস্যা এবং বয়স নির্বিশেষে শিক্ষাগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। শিক্ষার আলো যে শুধু শিশু-কিশোরদের জন্য নয়, বরং যেকোনো বয়সের মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে—এই মানবিক বার্তাই চলচ্চিত্রটির অন্যতম তাৎপর্য।
সমাজের সাধারণ মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এমন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আজিজুর রহমান বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিরও চেষ্টা করেছেন।
বৈচিত্র্যময় চলচ্চিত্র নির্মাণ
আজিজুর রহমানের চলচ্চিত্রজগৎ শুধু ‘ছুটির ঘণ্টা’ ও ‘অশিক্ষিত’-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন ধরনের কাহিনি, সামাজিক সমস্যা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানুষের জীবনের নানা দিক নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।
তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
▪️ অতিথি
▪️ স্বীকৃতি
▪️ অপরাধ
▪️ গরমিল
▪️ মায়ের আঁচল
▪️ জনতা এক্সপ্রেস
▪️ সাইফুল মূলক বদিউজ্জামান
▪️ অশিক্ষিত
▪️ ছুটির ঘণ্টা
চলচ্চিত্রের বিষয় নির্বাচনে তিনি বৈচিত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। কখনো লোককাহিনি, কখনো পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতা, আবার কখনো শিশুদের জীবন ও নিরাপত্তার মতো বিষয় তাঁ…
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা