আবু জাফর, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সম্প্রতি দেশে আবারও উদ্বেগের নাম হয়ে উঠেছে ‘হাম’। বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা, ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন জেলায়। এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকিও। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—আতঙ্ক নয়, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসাই পারে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম জানান, জেলায় সন্দেহভাজন ৪০ জনের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে একজনের হাম এবং আরেকজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে।
হঠাৎ কেন বাড়ছে হাম?
সাতক্ষীরা সরকারি শিশু হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শামছুর রহমান বলেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, মায়ের বুকের দুধ কম খাওয়ানো, কৃমিনাশক ওষুধ না দেওয়া এবং অপুষ্টির কারণে হামের প্রকোপ বাড়ছে।
অনেক শিশু ইপিআই কর্মসূচির বাইরে থাকায় তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। আবার কেউ কেউ প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ না নেওয়ায় ঝুঁকিতে পড়ছে।
যেভাবে বুঝবেন শিশু হামে আক্রান্ত
হামের লক্ষণগুলো সাধারণত ধাপে ধাপে দেখা দেয়—
প্রথমে জ্বর, কাশি এবং নাক দিয়ে পানি পড়া
চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও আলোতে কষ্ট হওয়া
কয়েকদিন পর মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়া
কেন টিকা জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম শুধু জ্বর বা ফুসকুড়ি নয়—এটি মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। এতে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি অপুষ্টি দেখা দিতে পারে, যা শিশুর জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই সময়মতো টিকা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুকে সুরক্ষিত রাখতে করণীয়
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার জয়ন্ত সরকার বলেন—
নির্ধারিত সময়ে এমএমআর টিকা দিতে হবে
আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখতে হবে
হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢাকার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে
জ্বর ও র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে
আতঙ্ক নয়, সতর্কতা
ডা. শামছুর রহমানের ভাষায়, জ্বর বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে ভয় না পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। গ্রাম্য চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে সরাসরি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা নিলে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব।
সচেতনতা বাড়ানো জরুরি
মানবাধিকার কর্মী মাধবচন্দ্র দত্ত বলেন, হাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে মাঠপর্যায়ে ক্যাম্পেইন, উঠান বৈঠক এবং প্রচারণা জোরদার করা প্রয়োজন।
বাস্তব অভিজ্ঞতা
আশাশুনির বাসিন্দা সুব্রত জানান, তার সন্তান প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসায় সুস্থ না হলেও পরে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছে। এতে সঠিক চিকিৎসার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।
কোথায় ও কখন টিকা
সরকারি ইপিআই কর্মসূচির পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও এমএমআর টিকা পাওয়া যায়।
প্রথম ডোজ: ৯ মাস বয়সে
দ্বিতীয় ডোজ: ১৫ মাস বয়সে
প্রস্তুত স্বাস্থ্য বিভাগ
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ইতোমধ্যে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। গুরুতর রোগীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সিভিল সার্জন জানান, সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে সতর্ক করা হয়েছে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত ও সচেতনতা বাড়াতে স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শেষ কথা
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো টিকা, সচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিলে সহজেই এ রোগ মোকাবিলা সম্ভব। তাই গুজবে কান না দিয়ে সচেতন থাকুন, শিশুকে সুরক্ষিত রাখুন।