সাতক্ষীরায় বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু
আবু জাফর, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উৎসবের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ পহেলা বৈশাখ উদযাপনে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরা। আনন্দ, বর্ণিলতা ও ঐতিহ্যের আবহে সোমবার (১৪ এপ্রিল) সকাল থেকে শুরু হয়েছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনের নানা আয়োজন।
সকালে ঠিক ৮টায় সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কালেক্টরেট পার্কে জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গান ‘এসো হে বৈশাখ’ গাওয়ার মধ্য দিয়ে দিবসের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার। তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, বাংলা নববর্ষ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ঐক্য ও সংস্কৃতির প্রতীক—যা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন আলহাজ্ব আব্দুর রউফ, বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ১০৬—সাতক্ষীরা-২), সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাতক্ষীরা জেলা বিএনপি এবং জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলুসহ দলের নেতা-কর্মীরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন, মুখোশ, গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীকী উপস্থাপন এবং লোকজ সংস্কৃতির বিভিন্ন নিদর্শনে শোভাযাত্রাটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। ঢাক-ঢোল, বাউল গান ও লোকজ সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো শহর।
শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে শুরু হয়েছে সাত দিনব্যাপী বৈশাখী উদ্যোক্তা মেলা, যা স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। প্রায় ৫০টি স্টলে দেশীয় হস্তশিল্প, পোশাক, মাটির তৈজসপত্র, নকশিকাঁথা ও বিভিন্ন খাবার প্রদর্শন ও বিক্রি করা হচ্ছে।
মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল, সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ বাসুদেব বসু, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিষ্ণুপদ পাল এবং বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক গৌরব দাসসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
উদ্বোধনের পর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় শিল্পীরা গান, নৃত্য, আবৃত্তি ও নাট্য পরিবেশনার মাধ্যমে বাঙালির ঐতিহ্য তুলে ধরেন। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
এদিকে পুরো শহরজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ। সকাল থেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ বের হয়েছেন বৈশাখী সাজে। নারীদের রঙিন শাড়ি, পুরুষদের পাঞ্জাবি-পায়জামা এবং শিশুদের উচ্ছ্বাসে প্রাণের উৎসবে রূপ নিয়েছে সাতক্ষীরা। শহরের বিভিন্ন স্থানে পান্তা-ইলিশ, পিঠাপুলি ও দেশীয় খাবারের দোকান বসেছে, যা উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছেন এ আয়োজনগুলোতে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
সব মিলিয়ে বর্ণিল শোভাযাত্রা, প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আয়োজন ও লোকজ ঐতিহ্যের সমন্বয়ে সাতক্ষীরায় বাংলা নববর্ষ উদযাপন নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির সংস্কৃতিকে আরও শক্তভাবে তুলে ধরছে—এমনটাই মনে করছেন আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা