কিংবদন্তি ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ–এর কনিষ্ঠ পুত্র, বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী শিল্পী, গবেষক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা জামান আব্বাসী–কে তাঁর প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।
বাংলার লোকসঙ্গীত—বিশেষ করে ভাওয়াইয়া গান—বিশ্বদরবারে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে যাঁদের অবদান অবিস্মরণীয়, মুস্তাফা জামান আব্বাসী তাঁদের অন্যতম।
তিনি ছিলেন একাধারে শিল্পী, গবেষক, সংগ্রাহক, উপস্থাপক, সাহিত্যিক, অনুবাদক ও দার্শনিক চিন্তার মানুষ। বাংলা সংস্কৃতির প্রতি তাঁর নিবেদন ছিল আজীবনের সাধনা।
১৯৩৬ সালের ৮ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে তাঁর জন্ম।
তিনি ছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের তৃতীয় ও কনিষ্ঠ পুত্র।
তাঁর পরিবার ছিল এক অনন্য সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানভিত্তিক পরিবার—
▪️ বড় ভাই মোস্তফা কামাল ছিলেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি।
▪️ বোন ফেরদৌসী রহমান ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী।
শৈশব থেকেই তিনি সঙ্গীতচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেন ওস্তাদ মুহম্মদ হোসেন খসরু ও গুল মোহাম্মদ খাঁ–এর কাছে।
সুর, ভাষা, ব্যাখ্যা ও গবেষণায় তিনি হয়ে ওঠেন তাঁর পিতা আব্বাসউদ্দীনের প্রকৃত সাংস্কৃতিক উত্তরসূরি।
লোকসঙ্গীত নিয়ে তাঁর গবেষণা বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অনন্য অবদান।
তিনি ৫০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন।
ভাওয়াইয়া গানের ওপর তাঁর দুটি বৃহৎ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে প্রায় ১২০০টিরও বেশি গান—যা ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য অমূল্য সম্পদ।
লোকসঙ্গীত ছাড়াও সুফি সাহিত্য ও দর্শনের প্রতিও ছিল তাঁর গভীর আকর্ষণ।
তিনি জালালউদ্দিন রুমি, নিফফারি, সুলতান বাহু প্রমুখ সুফি সাধকের কবিতার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- ‘আব্বাসউদ্দীন আহমদ: মানুষ ও শিল্পী’
- ‘কাজী নজরুল ইসলাম: ম্যান অ্যান্ড পোয়েট’
- ‘পুড়িব একাকী’
- ‘সাগা অব টাইম’
টেলিভিশনে জনপ্রিয়তা-
বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান—
- ‘আমার ঠিকানা’
-‘ভরা নদীর বাঁকে’
তাঁর উপস্থাপনায় হয়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক ইতিহাসের স্মরণীয় অধ্যায়।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি-
বাংলা সঙ্গীত ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন—
- একুশে পদক (১৯৯৫)
- নজরুল মেলা আজীবন সম্মাননা (২০১৩)
তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ‘কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাসউদ্দীন আহমদ গবেষণা ও শিক্ষা কেন্দ্র’-এর গবেষক হিসেবেও যুক্ত ছিলেন।
ব্যক্তিজীবনে তাঁর স্ত্রী আসমা আব্বাসী ছিলেন শিক্ষাবিদ ও লেখিকা।
দুই কন্যা—
▪️ সামিরা আব্বাসী
▪️ শারমিনী আব্বাসী
দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগে ১০ মে ২০২৫ সালে ঢাকার একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাংলার লোকসঙ্গীতের এই জীবন্ত কিংবদন্তির সৃষ্টি, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক অবদান আমাদের চিরকাল পথ দেখাবে।
তাঁর কণ্ঠ, তাঁর চিন্তা ও তাঁর সাংস্কৃতিক সাধনা বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে।
গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি এই সঙ্গীত সাধককে। 🌹
চিরশান্তিতে বিশ্রাম করুন
মুস্তাফা জামান আব্বাসী।