ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে তিনি টিভি অভিনয় দিয়ে অভিনয় জীবন শুরু করলেও চলচ্চিত্রেই তাকে বেশি দেখা গেছে। তার দীর্ঘ ৩৫ বছরের অভিনয় জীবনে প্রায় ২৫০ এর অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য পেয়েছেন বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
রওশন জামিল ১৯৩১ সালের ৮ মে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ঢাকার রোকনপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকার লক্ষীবাজারের সেন্ট ফ্রান্সিস মিশনারী স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর পড়াশুনা করেন ইডেন কলেজে। শৈশব থেকেই তার নাচের প্রতি ঝোঁক ছিল। ম্যাট্রিক পাশ করার পর ভর্তি হন ঢাকার ওয়ারী শিল্পকলা ভবনে ও নাচের তালিম নেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী গওহর জামিল এর কাছ থেকে।
নৃত্যশিল্পী হলেও একজন অভিনেত্রী হিসেবেও রওশন জামিল সর্বজনশ্রদ্ধেয়। এ দেশে যখন ছেলেদের মেয়ে সেজে মঞ্চে অভিনয় করতে হতো, সেই তখনই (১৯৫২ সালের দিকে) রওশন জামিল জগন্নাথ কলেজে মঞ্চায়িত শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ নাটকে অভিনয় করেন।
আর ১৯৬৫ সালে টেলিভিশনে ‘রক্ত দিয়ে লেখা’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে রওশন জামিলের অভিনয় জীবন শুরু হয়। বিটিভির ‘ঢাকায় থাকি’ এবং ‘সকাল সন্ধ্যা’ ধারাবাহিক নাটকের অভিনয় তাকে অবিস্মরণীয় করে রেখেছে।
অন্যদিকে ১৯৬৭ সালে আরব্য রূপকথা ‘আলি বাবা চল্লিশ চোর’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যাত্রা করেন রওশন জামিল। ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান পরিচালিত 'জীবন থেকে নেয়া' চলচ্চিত্রে আপা চরিত্র তাকে সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে আসে। তাছাড়া আমজাদ হোসেনের রচনা ও পরিচালনায় নয়নমনি, আবু ইসহাকের উপন্যাস অবলম্বনে শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের পরিচালিত সূর্য দীঘল বাড়ী চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে। ঢাকার ওয়ারী শিল্পকলা ভবনে নাচ শেখার সময় পরিচয় হয় প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী গওহর জামিলের সাথে এবং ১৯৫২ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ২ ছেলে ও ৩ মেয়ে।
১৯৫৯ সালে নৃত্যশিল্পী গওহর জামিল ও তিনি দুজনে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন নৃত্য প্রশিক্ষন কেন্দ্র জাগো আর্ট সেন্টার। ১৯৮০ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর তিনিই এই সংগঠনের দেখাশুনা করতেন। রওশন জামিল ২০০২ সালের ১৪ মে বাংলাদেশের ঢাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার (এফডিসি) প্রবেশদ্বারে 'নয়ন সম্মুখে তুমি নাই' শিরোনামের ফলকে প্রয়াত চলচ্চিত্রকারদের সাথে তার নাম খোদাই করা আছে।
সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য রওশন জামিল দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, টেনাশিনাস পদক, সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড, বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার, তারকালোক পুরস্কার। আর নৃত্যে তিনি ১৯৯৫ সালে একুশে পদক লাভ করেন। আজীবনের এই সংস্কৃতি কর্মী আজ দেহ নিয়ে আমাদের মাঝে না থাকলেও তার জীবন ও কর্ম রয়ে গেছে অনুপ্রেরণার বিরাট মানচিত্র হয়ে। যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন তিনি। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের নাচ, আমাদের অভিনয় এবং চলচ্চিত্রে অমর হয়ে থাকবেন তিনি। নৃত্যশিল্পী, শিক্ষক, অভিনেত্রী রওশন জামিলের স্মৃতির প্রতি জানাই এন্টার টিভি পরিবারের পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।