সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার ৪ নম্বর দৌলতপুর ইউনিয়নের মতি মার্কেট এলাকায় অবস্থিত একটি প্রসেস মিলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণ, পানিদূষণ ও জনদুর্ভোগের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, মিলটির মালিক হাজী আব্দুস সাত্তার (ছত্তর হাজী), যিনি দৌলতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশগত নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে মিলটি পরিচালনা করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মিলটির কোনো কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় উৎপাদন কার্যক্রমে ব্যবহৃত দূষিত ও রাসায়নিক মিশ্রিত পানি আশপাশের পুকুর, ডোবা ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে অন্যের ব্যক্তিগত পুকুরেও জোরপূর্বক এই দূষিত পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে। প্রতিবাদ করতে গেলে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হুমকি এমনকি শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, প্রসেস মিল থেকে নির্গত দূষিত পানি ও ধোঁয়ার কারণে আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে স্থানীয়দের অনেকেই প্রায় ৫০০ মিটার দূর থেকে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক হাজার পরিবারের বসবাস এই এলাকায়। এছাড়া এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগলেও অনেকেই নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মতি মার্কেট এলাকার দৌলতপুর মতি মার্কেট তাজবিদুল কোরআন নূরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গোসলের পানির সংকটে শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক জুবায়ের হোসেন বলেন,
প্রসেস মিলের কারণে আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে না। অনেক সময় টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করতেও ভয় লাগে। শিক্ষার্থীদের গোসল ও খাবার পানির জন্য দূর থেকে পানি আনতে হয়। এতে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। আমরা বারবার বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি, কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।"
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রসেস মিলের দূষিত পানির কারণে মশার উপদ্রবও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সন্ধ্যার পর মশার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে বিভিন্ন রোগব্যাধির ঝুঁকিও বেড়েছে বলে তারা জানান।
প্রসেস মিলের পাশেই অবস্থিত দৌলতপুর মতি মার্কেট বাজার। বাজারের ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের অভিযোগ, মিল থেকে নির্গত দুর্গন্ধ ও দূষণের কারণে বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে দূষিত পানি ও দুর্গন্ধের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
স্থানীয়রা আরও জানান, বর্তমানে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দূষিত পানি ছড়িয়ে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এই দূষিত পানি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ে, ফলে আরও বৃহৎ এলাকা পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে মিলটি বন্ধ অথবা অন্যত্র স্থানান্তরের বিষয়ে একাধিকবার আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সংখ্যালঘু হিন্দু বাসিন্দা জানান, তারা এ বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে বিভিন্নভাবে চাপ ও হয়রানির শিকার হন। নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে চান না।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আজিজুল হক পলাশ বলেন,
"জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা ভোট চাইতে এলাকায় গেলে স্থানীয় মানুষ এই প্রসেস মিলের কারণে তাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথা জানান। তখন আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে এ সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এখন আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, অতি দ্রুত এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে গণআন্দোলনের মাধ্যমে এর সমাধান করা হবে।"
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রসেস মিলের দূষণ ও জনভোগান্তির বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ও আবেদন করা হয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরিন জাহান বলেন,
এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
এলাকার সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি এলাকাবাসীর জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রসেস মিলের মালিক হাজী আব্দুস সাত্তারের বক্তব্য জানার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
আল-আমিন হোসেন, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
