বাংলা নাটক, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বুলবুল আহমেদ এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর পুরো নাম ছিল তবাররুক আহমেদ বুলবুল। পুরান ঢাকার আগা মসি লেনে জন্ম নেওয়া এই প্রতিভাধর অভিনেতার বাবা খলিল আহমেদ ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং শৌখিন অভিনেতা। বাবার অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই তিনি নাটক ও সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হন।
শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিক, ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে আইএ, নটরডেম কলেজ থেকে ১৯৬১ সালে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে ১৯৬৩ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে কিছুদিন সিলেট এমসি কলেজেও পড়াশোনা করেছেন। সিলেটে এমসি কলেজে থাকাকালে মঞ্চনাটক চিরকুমার সভায় নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে উপস্থিত সবার নজর কাড়তে সক্ষম হন।
পড়াশোনা শেষ করার পর তৎকালীন ইউবিএল ব্যাংক টিএসসি শাখার ম্যানেজার হিসেবে ১০ বছর চাকরি করেন।[
চাকরির পাশাপাশি বুলবুল আহমেদ টিভিতে অভিনয় করতে থাকেন। বুলবুল আহমেদ অভিনীত প্রথম টিভি নাটক আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘'বরফ গলা নদী’'। এটি ১৯৬৪ সালে প্রচারিত হয়। এরপর নিয়মিতভাবে টিভি নাটকে কাজ করতে থাকেন তিনি।
মঞ্চ নাটকের মাধ্যমেই তাঁর অভিনয় যাত্রার সূচনা। ১৯৬০ সালে ‘ড্রামা সার্কেল’-এ যোগ দিয়ে ইডিপাস ও আর্মস এ্যান্ড দি ম্যান নাটকে অভিনয় করেন। ১৯৬৮ সালে টেলিভিশনে অভিনয় শুরু এবং ১৯৭২ সালে আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম পরিচালিত ইয়ে করে বিয়ে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সিনেমায় অভিষেক হয়। ১৯৭৩ সালে জীবন নিয়ে জুয়া চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ও নাটক
চলচ্চিত্র: সীমানা পেরিয়ে, দেবদাস, মহানায়ক, দীপু নম্বর টু, মোহনা, শেষ উত্তর, হারানো মানিক, বধূ বিদায়, সোনার হরিণ, সূর্য্য কন্যা, রূপালী সৈকতে প্রভৃতি।
টিভি নাটক: শেষ বিকালের মেয়ে, বরফ গলা নদী, আরেক ফাল্গুন, ইডিয়ট, মালঞ্চ, বড়দিদি, শুভা, এইসব দিনরাত্রি।
শুধু অভিনয় নয়, তিনি পরিচালক হিসেবেও সফল ছিলেন। রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত ও আকর্ষণ চলচ্চিত্র পরিচালনা করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। বুলবুল আহমেদ পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ছবি হচ্ছে ওয়াদা, মহানায়ক, ভালো মানুষ, রাজলক্ষ্মী-শ্রীকান্ত, আকর্ষণ, গরম হাওয়া, কত যে আপন প্রভৃতি।
পুরস্কার ও সম্মাননা
চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা:
১. সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭)
২. বধূ বিদায় (১৯৭৮)
৩. শেষ উত্তর (১৯৮০)
৪. দীপু নম্বর টু (১৯৯৬)
রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত (১৯৮৭) এর জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
এছাড়া জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৭৬), বাচসাস পুরস্কার (১৯৮২), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার (১৯৮০), টেনশিনাস পদক (১৯৯২), ফুলকলি পুরস্কার (২০০০), টেলিভিশন দর্শক পুরস্কার (২০০৪) সহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হন।
বুলবুল আহমেদের স্ত্রী ডেইজি আহমেদ। এই দম্পতির তিন সন্তান হলেন মেয়ে তাহসিন ফারজানা তিলোত্তমা, ঐন্দ্রিলা আহমেদ এবং ছেলে শুভ।
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই মহান শিল্পী ২০১০ সালের ১৪ জুলাই ঢাকায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বুলবুল আহমেদ কেবল অভিনেতা নন, ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী, যিনি বাংলা সংস্কৃতিকে করেছেন সমৃদ্ধ। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই মহানায়কের শিল্পঋণ।