রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বাংলাদেশ পেরিয়ে সিকিমে রহস্যময় ‘সুবোধ’: তদন্তে ভারতীয় পুলিশ

বাংলাদেশ পেরিয়ে সিকিমে রহস্যময় ‘সুবোধ’: তদন্তে ভারতীয় পুলিশ

বাংলাদেশ পেরিয়ে সিকিমে রহস্যময় ‘সুবোধ’: তদন্তে ভারতীয় পুলিশ

বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ও রহস্যময় গ্রাফিতি চরিত্র ‘সুবোধ’ এবার দেখা দিয়েছে ভারতের সিকিমে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি একটি সেতুর পিলারে এই ম্যুরাল আবিষ্কারের পর বিষয়টি ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। শুধু শিল্পকর্ম হিসেবেই নয়, এর প্রতীকী অর্থ, অবস্থান এবং সম্ভাব্য বার্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। ইতোমধ্যে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে সিকিম পুলিশ।

সিকিমের সেতুর পিলারে ‘সুবোধ’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ফেডারেল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাংটক–রংপো সড়কের মাজিটার নালা ব্রিজের একটি পিলারে প্রায় ২০ ফুট × ১২ ফুট আকারের এই ম্যুরালটি স্প্রে পেইন্ট ও স্টেনসিলের সাহায্যে আঁকা হয়েছে।

বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের মাটিতে ‘সুবোধ’-এর এই উপস্থিতি নতুন করে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের সেই অজ্ঞাতনামা স্ট্রিট আর্টিস্ট ‘হবেকি’ কি সত্যিই ভারতে প্রবেশ করেছেন, নাকি এটি তার কোনো অনুসারীর কাজ?

নতুন ম্যুরালে কী দেখা গেছে?

এবারের ম্যুরালে সুবোধকে আগের মতো আতঙ্কিত বা পালিয়ে বেড়ানো অবস্থায় দেখা যায়নি। বরং খালি গায়ে তাকে কাঁটাতারের সঙ্গে বাঁধা একটি হ্যামকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।

তার এক হাতে রয়েছে একটি তার কাটার যন্ত্র (ওয়্যার কাটার) এবং নিচে রাখা একটি খালি বালতি। ম্যুরালের পাশে আগের মতোই রয়েছে শিল্পীর পরিচিত সিগনেচার টেক্সট— ‘হবেকি?’

প্রতীকগুলোর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা

দ্য ফেডারেল-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ম্যুরালে ব্যবহৃত কাঁটাতার আন্তর্জাতিক সীমান্তের প্রতীক হতে পারে। আর তার কাটার যন্ত্রটি সীমান্ত বা অন্য কোনো বাধা অতিক্রম করার ইঙ্গিত বহন করতে পারে।

হ্যামকটিকে দীর্ঘ পলায়নের পর বিশ্রাম বা আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে নিচে রাখা খালি বালতিটি সম্ভবত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত তিস্তা নদীর পানিবণ্টন ইস্যুর প্রতীকী ইঙ্গিত।

তবে শিল্পী ‘হবেকি’-র পরিচয় এখনো অজ্ঞাত থাকায় এসব ব্যাখ্যার সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

তদন্তে যা বলছে সিকিম পুলিশ

ঘটনার পর তদন্ত শুরু করেছে সিকিম পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য ফেডারেল জানিয়েছে, সিকিমের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর প্রতি তাদের প্রাথমিক সন্দেহ রয়েছে। বর্তমানে ওই শিক্ষার্থী ছুটিতে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ফোনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি। এর মধ্যেই কে বা কারা দেয়ালচিত্রটি বিকৃত করে দিয়েছে।’

পুলিশের ভাষ্য, প্রাথমিক তদন্তে ম্যুরালটি থেকে সরাসরি কোনো নিরাপত্তা হুমকি পাওয়া যায়নি। তবে এটি শিল্পী ‘হবেকি’ নিজে এঁকেছেন, নাকি তার কোনো অনুসারীর কাজ— তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই স্থান?

গ্যাংটক–রংপো সড়কটি সিকিমকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এটি সরাসরি শিলিগুড়ি করিডোরের সঙ্গে সংযুক্ত। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং চীনের তিব্বত অঞ্চলঘেরা এই করিডোর ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও যোগাযোগপথ হিসেবে পরিচিত।

শিলিগুড়িভিত্তিক প্রবীণ সাংবাদিক প্রবীর প্রামাণিক দ্য ফেডারেল-কে বলেন, ‘প্রতীকী হলেও এই অঞ্চলে যেকোনো অস্বাভাবিক তৎপরতা স্বাভাবিকভাবেই কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে।’

ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও বাড়ছে আলোচনা

চীনের সহায়তায় বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ভূরাজনৈতিক আলোচনা জোরদার হয়েছে। পাশাপাশি শিলিগুড়ি করিডোরের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে নয়াদিল্লিও এ অঞ্চলের পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে।

এদিকে গত ২৮ জুন বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর পরপরই এই ম্যুরালের আবির্ভাব নতুন করে নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে।

‘সুবোধ’ ও ‘হবেকি’: নীরব প্রতিবাদের এক প্রতীক

বাংলাদেশে ‘সুবোধ’ প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৭ সালের দিকে। ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, সময় এখন পক্ষে না’— এমন বার্তাসংবলিত গ্রাফিতির মাধ্যমে চরিত্রটি তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গুম, নিপীড়ন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে জনআলোচনার প্রতীক হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে পরিচয় গোপন রাখা শিল্পী ‘হবেকি’ ছদ্মনামে পরিচিত।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ও ‘সুবোধ’ ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। শিল্পীর আহ্বানে অনেকেই স্টেনসিল টেমপ্লেট ব্যবহার করে ঢাকার বিভিন্ন দেয়ালে এই গ্রাফিতি আঁকেন, যা আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত ভিজ্যুয়াল প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।

সিকিমে ‘সুবোধ’-এর আবির্ভাব কেবল একটি নতুন গ্রাফিতি নয়; এটি শিল্প, প্রতীকী বার্তা, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে ঘিরে নতুন আলোচনারও জন্ম দিয়েছে। ম্যুরালটির প্রকৃত শিল্পী কে, এর উদ্দেশ্য কী এবং এর পেছনে কোনো বিশেষ বার্তা রয়েছে কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্ত চলছে। তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও জল্পনা থাকলেও, নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আনুষ্ঠানিক তথ্যের অপেক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।