পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে ভারতে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। তরুণদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ৩৬ দিনের টানা আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য ও অপরাজেয় ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন। তবে জেন-জি প্রজন্মের এই প্রতিবাদে সেই ভাবমূর্তিতে প্রথম বড় আঘাত লাগল।
রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডাক্তারি ভর্তি পরীক্ষা নিটের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় এই বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেই ইনস্টাগ্রামে সেলফি ভিডিও দিয়ে তরুণদের শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দিল্লির রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। আন্দোলনকারীদের মুখে কোনো প্রথাগত স্লোগান ছিল না। বরং র্যাপ গান, ব্যাঙ্গাত্মক প্ল্যাকার্ড আর গ্রাফিতির মাধ্যমে তারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ও নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানান। অবশেষে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে আন্দোলনের প্রধান দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় কেন্দ্র। এটিকে মোদি সরকারের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল পিছু হটার ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ক্ষোভের পেছনে শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়, রয়েছে তীব্র বেকারত্ব আর তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে চাকরি হারানোর ভয়। ফলে এটি কেবল কোনো একক দাবি নয়; বরং দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ, হতাশা ও উদ্বেগের এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণ।
জেন-জি প্রজন্ম যা চায়, তা বুঝতে ব্যর্থ সরকার
ভারতে ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ হলেও লোকসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি। বিপরীতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার গড় বয়স ৬০ বছরের বেশি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, নরেন্দ্র মোদি সরকার ও বিজেপির ডিজিটাল রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে এক্স বা ফেসবুককেন্দ্রিক থাকলেও তরুণদের সিংহভাগ ইনস্টাগ্রামে সক্রিয়। তরুণদের মনোভাব ও নতুন সময়ের যোগাযোগের ধরন বুঝতে সরকার পিছিয়ে রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
পাটনা বাইপোলে জেন-জি ফ্যাক্টর
দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া এই ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব ছড়াতে শুরু করেছে স্থানীয় নির্বাচনেও। পাটনার বাঁকীপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে জেন-জি তরুণ ভোটাররা বড় প্রভাবক হয়ে উঠেছেন। এদিকে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বড় সাফল্য পেলেও এখনই পূর্ণকালীন রাজনীতিতে নামছে না সিজেপি। আন্দোলনের সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে গতকাল রোববার এক ভিডিও বার্তায় সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানান, এটি কেবল শুরু এবং তাদের ‘বহুদূর যেতে হবে’।
আপাতত রাজনীতিতে নামার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও তরুণদের এই অভূতপূর্ব আন্দোলন ও দাবিগুলোকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
রাহুলের ক্ষোভ ও অমিতের কাছে জবাব দাবি
দিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের টিয়ার গ্যাস ও পিলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে চিঠি দিয়েছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদরত তরুণদের দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ও পিলেট গান ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল কিনা? আহত কয়েকজন ছাত্রের শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, তরুণদের কণ্ঠকে দমন না করে সরকারের উচিত জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
নতুন শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশির দায়িত্ব গ্রহণ
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন প্রহ্লাদ জোশি। দায়িত্ব নিয়ে তিনি জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁর জন্য একটি নতুন ক্ষেত্র এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলে দ্রুত শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ দূর করাই হবে তাঁর অগ্রাধিকার।
