‘মুখে নুড়ো জ্বেলে দেব…’, দজ্জাল পিসিমা'কে জন্মদিনে স্মরণ করি..
বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দা কাঁপানো এক অনন্য নাম— গীতা দে। জন্মদিনে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি পর্দার অন্যতম সেরা খলচরিত্র অভিনেত্রীকে, যিনি বাস্তবে ছিলেন স্নেহময়ী, সহজ-সরল ‘গীতা মা’। খলচরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের ভালোবাসা যেমন পেয়েছেন, তেমনি তাঁদের ক্ষোভের শিকারও হয়েছেন। একবার সিনেমা হলে নিজের চরিত্র দেখে এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিল দর্শক, যে তাঁকে প্রায় আক্রমণ করেই বসেছিল! তবে গীতা দে মনে করতেন, এটাই তাঁর অভিনয়ের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।
গীতা দে কে দর্শক বরাবরই সিনেমার পর্দায় একজন দজ্জাল, ঝগরুটে, কুচুটে চরিত্রে অভিনয় করতে দেখে অভ্যস্ত। পর্দায় গীতা দের উপস্থিতি মানেই ছিল, সংসার ভাঙা শুরু। তাই গীতার উপস্থিতি পর্দায় ঘটলেই দর্শক বেজায় চটে যেত। একবার সিনেমা হলে ছবি দেখতে গিয়েছিলেন অভিনেত্রী। শো-য়ের মাঝেই সিনেমা হলের আলো জ্বলে ওঠে। হঠাৎ দর্শকের নজরে পড়ে যান তিনি। সেদিন মারমুখী দর্শকের হাত থেকে কোনও মতে প্রাণে বেঁচে ছিলেন গীতা দে। যদিও দর্শকের এই তিরস্কারই গীতার কাছে ছিল পুরস্কারের সমান। পর্দার মতো বাস্তবেও কি গীতা দে খলনায়িকা ছিলেন? তা কিন্তু নয়। গীতা দে জীবন সম্পর্কে জানলে কিন্তু চমকে যাবেন!
পর্দায় যতই অন্যায় করা হোক না কেন, বাস্তবে কিন্তু গীতা দে ছিলেন খুবই সাধাসিধে স্নেহশীলা একজন নারী। ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই তাঁকে গীতা মা বলে সম্বোধন করতো। সরলতার জন্যই গীতা কে জীবনে অনেকবার ঠকতে হয়েছিল। উত্তর কলকাতার দর্জিপাড়ার মেয়ে গীতা দের বাবা ছিলেন বিলেত ফেরত চিকিৎসক। শখে নয়, নিয়তি গীতাকে নিয়ে এসেছিল অভিনয় জগতে।
গীতার পাশের বাড়িতেই থাকতেন কীর্তন শিল্পী রাধারানি দেবী। তাঁর কাছেই গীতার গানের তালিম নেওয়া শুরু। গীতার বয়স যখন মাত্র পাঁচ, তখনই তাঁর বাবা মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর থেকে মায়ের কাছেই থাকা শুরু হয় গীতার।
বিচ্ছেদের পর গীতার মা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। গীতার দুই ভাই বোনও হয়। পরিবারের প্রতি কোনও কর্তব্য না করেই গীতার নতুন বাবা সবাইকে ছেড়ে চলে যায়। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে তাঁর মা থিয়েটারে অভিনয় শুরু করেন। মাকে সাহায্য করতে মাত্র ছয় বছর বয়সে গীতাও চলে আসে অভিনয় জগতে।
১৯৩৭ সালে মাত্র ছ’বছর বয়সে তিনি ‘আহুতি’ নামে একটি বাংলা ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। ছবিটির পরিচালক ছিলেন ধীরেন গাঙ্গুলি।
১৪ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি সিনেমা ও থিয়েটারে অভিনয় করেছেন।
গীতা দের যখন পনেরো বছর বয়স, তখন তাঁর মা মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর দুই ভাই বোনের দায়িত্ব গীতার উপর চলে আসে। পরবর্তী সময় অসীম কুমার দে নামের একজনের সঙ্গে বিয়ে হয় গীতার। কিন্তু অভিনয় জগতের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে সৎ শাশুড়ি পছন্দ করতেন না গীতাকে। তাই শিমূলতলায় হাওয়া বদলে পাঠিয়ে ছেলের অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেন তিনি। বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন অভিনেত্রী। কিন্তু বিচ্ছেদ না ঘটার কারণে স্বামীর পদবী তিনি আজীবন বহন করে গিয়েছেন তিনি।
বিয়ের ৫ বছর বাদে তিনি আবার অভিনয় জীবনে ফিরে যান। সে সময়ে তিনি প্রখ্যাত নট ও পরিচালক শিশিরকুমার ভাদুড়ীর সংস্পর্শে আসেন।
গ্রুপ থিয়েটারে তিনি অভিনয় করেছেন বেশ কিছু বিখ্যাত পরিচালকের সঙ্গে।
যেমন তুলসী লাহিড়ী, শম্ভু মিত্র, তুলসী চক্রবর্তী, জ্ঞানেশ মুখার্জি, কালী সরকার, কানু ব্যানার্জি, দিলীপ রায় প্রমুখের সঙ্গে।
তাঁর অভিনীত শেষ নাটক — ‘বাদশাহী চাল’।
১৯৯৬ সালে উত্তর কলকাতার রঙ্গনা মঞ্চে এই নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন গণেশ মুখোপাধ্যায়।
গীতাকে সত্যজিৎ রায় প্রথম অন্তর্ভুক্ত করেন ‘সমাপ্তি’ ছবিতে।
ঋত্বিক ঘটকের বিখ্যাত ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবিতে গীতা অভিনয় করেন নায়কের মায়ের চরিত্রে।
ঋত্বিকের ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘সুবর্ণরেখা’ ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন গীতা দে।
এছাড়াও তপন সিনহার ‘হাটে বাজারে’, ‘জুতগৃহ’ এবং ‘এখনি’ ছবিগুলোতে গীতা অভিনয় করেছিলেন।
গীতার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন খ্যাতিমান অভিনেতা ও চিত্র পরিচালক লরেন্স অলিভার।
গীতা দের সুপারহিট ছবি গুলি হল, ইন্দ্রাণী, মেঘে ঢাকা তারা, ডাইনী, দুই ভাই, তিন কন্যা, শুভ দৃষ্টি, বন্ধন, সাত পাকে বাঁধা, পিতা পুত্র, মৌচাক ,বাঘ বন্দী খেলা, দত্তা, পরিণীতা, চিরদিনি তুমি যে আমার, নৌকা ডুবি প্রমুখ।
তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ অল ইন্ডিয়া রেডিও প্রচারিত শ্রুতি নাটক অনুষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় ড. এপিজে আবদুল কালামের কাছ থেকে তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কারসহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার অর্জন করেছেন।
সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে অন্যতম প্রভাবশালী অভিনেত্রী গীতা দে চলে গেলেন ৭৯ বছর বয়সে। কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
কিন্তু দর্শকের হৃদয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন— ‘গীতা মা’ হয়ে।
যারা খলচরিত্রে সেরা, তারা বাস্তবে হয়তো সবচেয়ে ভালো মানুষই হন। গীতা দে তার এক অনন্য উদাহরণ।