রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

দাঁড়িপাল্লায় ওঠে শতবর্ষের স্বাদ বরমীর ‘রুটি মহল’ এ ওজনে বিক্রি হয় ঐতিহ্যবাহী তুন্দুল রুটি

দাঁড়িপাল্লায় ওঠে শতবর্ষের স্বাদ বরমীর ‘রুটি মহল’ এ ওজনে বিক্রি হয় ঐতিহ্যবাহী তুন্দুল রুটি

দাঁড়িপাল্লায় ওঠে শতবর্ষের স্বাদ বরমীর ‘রুটি মহল’ এ ওজনে বিক্রি হয় ঐতিহ্যবাহী তুন্দুল রুটি

শ্রীপুর(গাজীপুর)প্রতিনিধি

 দাঁড়িপাল্লার এক পাশে রুটি, অন্য পাশে ওজন। ক্রেতা বলছেন যতটুকু চান, দোকানি ততটুকুই মেপে তুলে দিচ্ছেন ব্যাগে। পাশে বিশাল চুলায় একের পর এক রুটি তৈরি হচ্ছে। কেউ দোকানে বসে গরম রুটি খাচ্ছেন ডাল ও শুকনা মরিচের ভর্তা দিয়ে, কেউ আবার পরিবারের জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে। হাটের দিন হওয়ায় ক্রেতাদের ভিড়ে সরগরম পুরো গলি। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত এই গলির নাম রুটি মহল’।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার প্রায় দুই শ বছরের পুরোনো বরমী বাজারে শতবর্ষ ধরে চলে আসছে ঐতিহ্যবাহী তুন্দুল রুটির ব্যবসা। বাজারের ফলপট্টির পাশের সরু এই গলিতে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩টি রুটির দোকান। তবে বুধবার সাপ্তাহিক হাটের দিনে বদলে যায় পুরো দৃশ্য। সকাল থেকেই রুটি মহলে জমে ওঠে ক্রেতাদের ভিড়।
বরমীর তুন্দুল রুটির বিশেষত্ব শুধু স্বাদে নয়, বিক্রির পদ্ধতিতেও। দেশের অন্য অনেক জায়গায় রুটি পিস হিসেবে বিক্রি হলেও এখানে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে রুটি বিক্রি হয়। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী কেজি কিংবা তার কম-বেশি রুটি মেপে দেওয়া হয়। ফলে পরিবারের জন্য একসঙ্গে বেশি রুটি কিনতে আসা মানুষের কাছে এ পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়।
রুটি মহলের অন্যতম ব্যস্ত দোকান কফিল উদ্দিনের। বুধবার সকাল থেকেই তাঁর ছোট্ট টিনের দোকানে ছিল উপচে পড়া ভিড়। দোকানের সামনে বড় টেবিলে সাজানো তুন্দুল রুটি ও জিলাপি। একদিকে কফিল ক্রেতাদের ডেকে রুটি বিক্রি করছেন, অন্যদিকে তাঁর দুই ছেলে ও দুই সহকারী ব্যস্ত দোকানে বসে খাওয়া ক্রেতাদের খাবার পরিবেশনে।
দোকানের ভেতরে কয়েকটি বেঞ্চ থাকলেও হাটের দিনে বসার জায়গা পাওয়া কঠিন। কেউ জায়গা খালি হওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকছেন, কেউ রুটি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ বাজার করতে এসে নাশতা করছেন, আবার কেউ দূর এলাকা থেকে বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন শুধু বরমীর তুন্দুল রুটির স্বাদ নিতে।
রুটি তৈরির দৃশ্যও নজরকাড়া। দোকানের এক পাশে বিশাল ও গভীর চুলা। সামনে বসে কারিগর আটার মণ্ড থেকে রুটি তৈরি করছেন। প্রথমে মণ্ড বেলে নেওয়া হয়। পরে হাতের আঙুলের বিশেষ কৌশলে সেটিকে আরও বড় ও পাতলা করা হয়। কাপড়ের তৈরি চেপ্টা পাত্রে রেখে রুটিটি চুলার ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ফুলে ওঠে রুটি। ছোট লোহার দণ্ড দিয়ে তা বের করে এনে রাখা হয় টেবিলে। এরপর ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী দাঁড়িপাল্লায় মেপে বিক্রি করা হয়।
কফিল উদ্দিনের দোকানে প্রতি কেজি তুন্দুল রুটির দাম ১২০ টাকা। দোকানে বসে খেলে বড় রুটি ২০ টাকা এবং ছোট রুটি ১০ টাকা। সঙ্গে থাকে ডাল, সবজি ও শুকনা মরিচের ভর্তা। অনেকে আবার জিলাপির সঙ্গেও তুন্দুল রুটি খান।
বরমী বাজারে গরু কিনতে এসে রুটি মহলে নাশতা করছিলেন মো. সুরুজ মিয়া। তিনি বলেন, “বরমী বাজারের তুন্দুল রুটি বহু বছর ধরে পরিচিত। বাজারে এলে অন্য পণ্যের পাশাপাশি অনেকেই এই রুটিও কিনে বাড়ি নিয়ে যান।”
কাওরাইদ থেকে তিন বন্ধুকে নিয়ে রুটি খেতে এসেছিলেন মো. আসাদুজ্জামান। তাঁর কাছে তুন্দুল রুটি শুধু খাবার নয়, বরমী বাজারের ঐতিহ্যের অংশ। তিনি বলেন, প্রায় দুই শ বছরের পুরোনো এই বাজারের সঙ্গে তুন্দুল রুটির সম্পর্কও বহু দিনের। অন্য জায়গাতেও তুন্দুল রুটি তৈরি হয়, তবে বরমীর রুটির স্বাদ আলাদা। এটি নরম ও সুস্বাদু।
প্রতি বুধবার হাটে এসে তুন্দুল রুটি খান শামসুল আলম। ডাল ও শুকনা মরিচের ভর্তা দিয়ে রুটি খাওয়াই তাঁর পছন্দ। পরিবারের সদস্যদের জন্যও ওজন করে রুটি কিনে নিয়ে যান তিনি।
রুটি কিনতে আসা হিরন মিয়া বলেন, “বরমী বাজারের রুটি মহল এখন এই বাজারেরই একটি পরিচয়। হাটে এলে রুটি খাওয়া ও বাড়ির জন্য রুটি নিয়ে যাওয়া অনেকেরই অভ্যাস হয়ে গেছে।”
কফিল উদ্দিনের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বুধবার হাটের দিনে তাঁর দোকানে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার তুন্দুল রুটি বিক্রি হয়। তবে চাহিদা বাড়ায় এখন শুধু হাটের দিন নয়, সপ্তাহের প্রতিদিনই রুটি তৈরি ও বিক্রি করছেন তিনি। সময়ের সঙ্গে রুটি মহলেও বেড়েছে দোকানের সংখ্যা।
কফিল উদ্দিন বলেন, “আমার দাদা থেকে বাবা, এরপর আমি এই ব্যবসা ধরে রেখেছি। শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি। রুটি বিক্রি করেই সংসার চলে। এটি শুধু ব্যবসা নয়, আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য।”
তবে ঐতিহ্যের এই ব্যবসায়ও পড়েছে মূল্যবৃদ্ধির চাপ। রুটি তৈরির উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো বড় আকারের রুটি তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এরপরও স্বাদ ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
কফিলের ছেলে সাগর বলেন, “বাবার সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই এই কাজে আছি। এই রুটি আমাদের পরিবারের ঐতিহ্য। আমরা চাই, ভবিষ্যতেও বরমীর তুন্দুল রুটির এই পরিচয় অটুট থাকুক।”
শতবর্ষের পুরোনো সেই স্বাদ এখনো টিকে আছে বরমী বাজারের সরু গলিতে। হাটের কোলাহলের মধ্যে দাঁড়িপাল্লায় যখন একের পর এক তুন্দুল রুটি ওঠে, তখন শুধু রুটিই বিক্রি হয় না বিক্রি হয় বরমী বাজারের শত বছরের এক টুকরো ঐতিহ্য।