৩১ আগস্ট সকাল। বিদ্যালয়ে পরীক্ষা ছিল ১৩ বছর ১১ মাস বয়সী কিশোরীটির। প্রতিদিনের মতো সেদিনও স্কুলের পোশাক পরে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল সে। কিন্তু সেই সকালেই যেন বদলে যায় সবকিছু।
পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার কথা ছিল। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কিশোরী বাড়িতে না ফেরায় প্রথমে স্বজনরা অপেক্ষা করেন। পরে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। একপর্যায়ে পরিবারের কাছে আসে অপহরণের অভিযোগ—বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের পাকা সড়ক থেকে কয়েকজন মিলে তাকে একটি সিএনজিতে তুলে নিয়ে গেছে।
এরপর থানায় মামলা। এক সপ্তাহের অনুসন্ধান।
অবশেষে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে পূর্বাচল এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোরীকে উদ্ধার করে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ। একই অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় মামলার প্রধান অভিযুক্ত জাহিদ হাসান রাজকে (২৫)।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন।
গ্রেপ্তার জাহিদ হাসান রাজ কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের দক্ষিণ পানজোড়া গ্রামের জামান রাজের ছেলে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ৩১ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে স্কুলের পোশাক পরে পরীক্ষা দিতে বাড়ি থেকে বের হয় কিশোরী।
পরীক্ষা শেষে তার বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও আর ফেরেনি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিতে শুরু করেন।
খোঁজাখুঁজির মধ্যেই তারা জানতে পারেন, বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের পাকা সড়ক থেকে কয়েকজন কিশোরীকে জোরপূর্বক একটি সিএনজিতে তুলে নিয়ে গেছে।
পরিবারের অভিযোগের তীর যায় স্থানীয় যুবক জাহিদ হাসান রাজের দিকে।
কিশোরীর মায়ের অভিযোগ, জাহিদ হাসান রাজ স্থানীয় যুবক এবং নিয়মিত তাদের বাড়িতে গিয়ে কিশোরীকে প্রাইভেট পড়াতেন।
মেয়ের নিখোঁজের পর পরিবারের সদস্যরা তার বাড়িতে গিয়ে কিশোরীর সন্ধান চান।
এজাহারে বলা হয়েছে, সেখানে কিশোরীকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তারা জানেন বলে জানানো হলেও তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। বরং তাকে ফেরত দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয় বলে অভিযোগ বাদীর।
এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে অভিযুক্তরা মারপিটে উদ্যত হন বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
কিশোরীর মা অভিযোগ করেছেন, বিষয়টি নিয়ে কোনো দরবার বা সালিশ করা হলে কিশোরীর জান-মালের ক্ষতি এবং পরিবারের সদস্যদের খুন-জখমের হুমকি দেওয়া হয়।
ঘটনার রাতেই কালীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগে জাহিদ হাসান রাজসহ চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাত আরও ২-৩ জনকেও আসামি করা হয়।
পরদিন, ১ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭/৩০ ধারায় অপহরণ মামলা রুজু করে পুলিশ।
মামলা হওয়ার পর কিশোরীকে উদ্ধারে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু করে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ। একই সঙ্গে আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টাও চলতে থাকে।
পুলিশের তদন্তে একপর্যায়ে কিশোরীর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় পূর্বাচল এলাকায়।
রোববার দিবাগত রাতে সেখানে অভিযান চালানো হয়।
অভিযান শেষে উদ্ধার করা হয় কিশোরীকে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় মামলার প্রধান অভিযুক্ত জাহিদ হাসান রাজকে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার এসআই অপূর্ব কুমার বাইন বলেন, মামলা হওয়ার পর থেকেই ভুক্তভোগীকে উদ্ধারে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। একপর্যায়ে পূর্বাচল এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে প্রধান অভিযুক্তকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
উদ্ধার করা কিশোরীকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
কিশোরী উদ্ধারের পর মামলাটি নিয়ে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী পক্ষ মামলাটি আপস-মীমাংসার জন্য বাদীকে বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার ওসি মো. জাকির হোসেন বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু হওয়ার পর থানায় কিংবা অন্য কোথাও বসে আপস-মীমাংসার সুযোগ নেই। বিষয়টির সিদ্ধান্ত আদালতেই হবে।
তিনি বলেন, ভুক্তভোগীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা হয়েছে। কিশোরীকে উদ্ধার এবং প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জাহিদ হাসান রাজকে সোমবার সকালে গাজীপুর আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
কিশোরীকে কীভাবে বিদ্যালয়ের সামনে থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কারা তাকে সিএনজিতে তুলেছিল, এক সপ্তাহ কোথায় রাখা হয়েছিল এবং এই ঘটনায় অন্য কারও ভূমিকা রয়েছে কি না-এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায়।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।
কিশোরী উদ্ধার এবং প্রধান অভিযুক্ত গ্রেপ্তারের পর মামলার তদন্ত এখন নতুন পর্যায়ে। সামনে আসতে পারে নিখোঁজের সেই সাত দিনের আরও অজানা তথ্য।
তৈয়বুর রহমান
কালীগঞ্জ, গাজীপুর
