শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

মানবমুক্তির গানের যোদ্ধা ভূপেন হাজারিকা'র শুভ জন্মদিন আজ

মানবমুক্তির গানের যোদ্ধা ভূপেন হাজারিকা'র শুভ জন্মদিন আজ

ENTER TV


মানবমুক্তির গানের যোদ্ধা ভূপেন হাজারিকা'র শুভ জন্মদিন আজ

“মানুষ মানুষের জন্য,
জীবন জীবনের জন্য…”
শুধু একটি গান নয়—মানবতা, সাম্য ও মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার এক চিরন্তন বার্তা। আর সেই বার্তাকে নিজের দরাজ, গভীর ও আবেগময় কণ্ঠে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন যিনি, তিনি ড. ভূপেন হাজারিকা।

আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার, সুরকার, গায়ক, কবি, চলচ্চিত্রকার, লেখক ও মানবতাবাদী শিল্পীকে।

১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অসমের সদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ভূপেন হাজারিকা। পিতা নীলকান্ত হাজারিকা ও মাতা শান্তিপ্রিয়া হাজারিকার সন্তান ভূপেনের শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। মাত্র ১০ বছর বয়সে গান লেখা ও সুর দেওয়া শুরু করেন তিনি।

মাত্র ১২ বছর বয়সে ‘ইন্দ্রমালতী’ চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার মাধ্যমে চলচ্চিত্রজগতে তাঁর প্রবেশ। পরবর্তীকালে তিনি অসমিয়া চলচ্চিত্রের গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও পরিচালক হিসেবে এক নতুন যুগের সূচনা করেন।
সংগীতের পাশাপাশি শিক্ষাজীবনেও ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা লাভ করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল গণযোগাযোগ ও প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেত্র।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তিনি আফ্রিকান-আমেরিকান শিল্পী ও মানবাধিকারকর্মী পল রোবসনের চিন্তা ও শিল্পচেতনায় গভীরভাবে প্রভাবিত হন। মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়, শোষণমুক্তি ও সাম্যের যে দর্শন পরবর্তীকালে তাঁর গানে বারবার ফিরে এসেছে, তার পেছনে এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

ভূপেন হাজারিকার গান ছিল মানুষের গান।
তাঁর সৃষ্টিতে উঠে এসেছে—
শ্রমজীবী মানুষের কথা
শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কথা
সাম্য ও মানবতার কথা
জাতি-ধর্মের বিভাজনের ঊর্ধ্বে মানুষের পরিচয়
প্রকৃতি ও নদীর সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক
অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
অসমিয়া ভাষার পাশাপাশি বাংলা ও হিন্দি ভাষাতেও তিনি অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে ‘মানুষ মানুষের জন্য’, ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’, ‘বিস্তীর্ণ দুপারের’, ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’—এসব গান শুধু সংগীত নয়, একেকটি সময়ের দলিল।


বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভূপেন হাজারিকার ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’ গানটি এক গভীর আবেগের নাম। দুই বাংলার নদী, মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির যে আত্মিক বন্ধন, তাঁর গানে তা অসাধারণভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

 

সংগীতের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণেও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। অসমিয়া চলচ্চিত্রকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তুলতে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সৃষ্টিশীলতা সংগীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও সমাজচিন্তাকে একই সুতোয় বেঁধেছিল।

 

সম্মাননা ও স্বীকৃতির দীর্ঘ তালিকা
তাঁর অসামান্য শিল্পীজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন—
- পদ্মশ্রী — ১৯৭৭
- সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার — ১৯৮৭
- দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার — ১৯৯২
- পদ্মভূষণ — ২০০১
- পদ্মবিভূষণ — ২০১২, মরণোত্তর
- ভারত রত্ন — ২০১৯, মরণোত্তর
ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারত রত্নে ভূষিত হয়ে তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

 

২০১১ সালের ৫ নভেম্বর, ৮৫ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে প্রয়াত হন ড. ভূপেন হাজারিকা।
কিন্তু একজন সত্যিকারের শিল্পীর মৃত্যু হয় না।
তাঁর শরীর চলে যায়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি থেকে যায় মানুষের মাঝে।
আজও যখন শোষিত মানুষের অধিকারের কথা ওঠে, যখন সাম্যের স্বপ্ন দেখা হয়, যখন দুই বাংলার মানুষের হৃদয়ে নদী ও মাটির টান অনুভূত হয়—তখন কোথাও না কোথাও বেজে ওঠে ভূপেন হাজারিকার সেই দরাজ কণ্ঠ।

 

“মানুষ মানুষের জন্য”—এই বিশ্বাসই ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার মূল দর্শন।
তিনি ছিলেন গানের মানুষ, মানুষের শিল্পী।
তিনি ছিলেন নদীর শিল্পী, মাটির শিল্পী, প্রতিবাদের শিল্পী।


তিনি ছিলেন মানবতার এক অবিনাশী কণ্ঠস্বর।
আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে কিংবদন্তি শিল্পী ড. ভূপেন হাজারিকার অমর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

তাঁর গান বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
তাঁর মানবতার বাণী ছড়িয়ে পড়ুক আরও বহুদূর।
আর তাঁর সেই প্রতিবাদী কণ্ঠ আমাদের মনে করিয়ে দিক—
মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই।

 

বিনোদন প্রতিবেদক

মোহিত লাল সাহা