রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

অবহেলায় পড়ে আছে ২০০ কোটি টাকার রেল অবকাঠামো

অবহেলায় পড়ে আছে ২০০ কোটি টাকার রেল অবকাঠামো

ENTER TV


অবহেলায় পড়ে আছে ২০০ কোটি টাকার রেল অবকাঠামো

১৩০ কোটি টাকার আইকনিক স্টেশন তালাবদ্ধ, বন্ধ স্থলবন্দর—রাজস্ব হারাচ্ছে রেলওয়ে।
উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি। সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ী। ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথটি ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৫৬ বছর পর ২০২১ সালের ১ আগস্ট আবারও চালু হয় এ রেলপথ। এরপর শুরু হয় পণ্য পরিবহন। পরের বছর চালু হয় ঢাকা-শিলিগুড়ি রুটের যাত্রীবাহী ট্রেন ‘মিতালি এক্সপ্রেস’।

চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনে মিতালি এক্সপ্রেসে ভারত যাওয়ার জন্য কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের কাজ সম্পন্ন করতে হতো ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন আইকনিক স্টেশন ভবন।

তবে স্থলবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভবনটি এখন তালাবদ্ধ। পড়ে আছে ব্যবহারহীন অবস্থায়।

২০২৫ সালের আগস্টে অবকাঠামো না থাকার কারণ দেখিয়ে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চিলাহাটি স্থলবন্দর বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই বন্ধ হয়ে যায় সীমান্ত বাণিজ্যের কার্যক্রম। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত আইকনিক ভবনসহ রেলপথের বিভিন্ন অবকাঠামো এখন অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, আইকনিক ভবনের একতলার বারান্দায় সারি সারি ফ্যান। দীর্ঘদিন ধরে সেগুলো আর ঘোরে না। জানালা দিয়ে দেখা যায়, ঘরের ভেতরে প্যাকেটবন্দী চেয়ার-টেবিল ও স্টিলের টুল পড়ে আছে। ধুলায় বিবর্ণ হয়ে গেছে সেগুলো। দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলোও খালি। তৃতীয় তলায় রেস্তোরাঁর জন্য রাখা জায়গাটিও ফাঁকা পড়ে আছে।

ভবনের পাশে থাকা দোতলা ভিআইপি অতিথিশালাটিও তালাবদ্ধ। একইভাবে অব্যবহৃত পড়ে আছে ওভারব্রিজ, যাত্রীছাউনি ও গার্ডরুম। সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইনের অনেক জায়গায়ও পড়েছে মরিচা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পণ্য পরিবহন চালু থাকাকালে চিলাহাটিকে ঘিরে শ্রমিক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা ছিল। এতে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। বেড়েছিল আশপাশের জমির দামও। বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসার সম্ভাবনা দেখে অনেকে বিনিয়োগের পরিকল্পনাও করেছিলেন। কিন্তু বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা অনেকটাই থেমে গেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘চিলাহাটি দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ অন্যান্য বন্দরের তুলনায় কম ছিল। এখন বুড়িমারী ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এসব বন্দর তুলনামূলক দূরে হওয়ায় পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে।’

ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাসুদেব রায় বলেন, ‘মিতালি এক্সপ্রেস চালুর পরও চিলাহাটিতে ইমিগ্রেশন সুবিধা না থাকায় ঢাকায় গিয়ে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের কাজ করতে হতো। পরে চিলাহাটিতে ইমিগ্রেশন সুবিধার জন্য এ আইকনিক ভবন নির্মাণ করা হয়। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর স্থলবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারের বিপুল অর্থের বিনিয়োগ এখন কাজে আসছে না।’

স্থানীয় বাসিন্দা কাজল ইসলাম বলেন, ‘বন্দর চালু থাকায় এলাকার দরিদ্র মানুষের কিছু কর্মসংস্থান হয়েছিল। কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর অনেকেই কাজ হারিয়েছেন। স্থলবন্দরটি দ্রুত চালু করা হলে স্থানীয় মানুষের উপকার হবে।’

নীলফামারী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মো. আবদুল ওয়াহেদ সরকার বলেন, ‘চিলাহাটি দিয়ে তুলনামূলক কম খরচে পাথর সৈয়দপুর পর্যন্ত আনা যেত। এখন পঞ্চগড় ও লালমনিরহাট হয়ে ট্রাকে পাথর আনতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়েছে। বন্দর বন্ধ হওয়ায় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও সরকার সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বার্থে এটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন।’

২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ, নেই কার্যক্রম

শুধু আইকনিক ভবন নির্মাণেই নয়, চিলাহাটি ও চিলাহাটি বর্ডার রেলপথ নির্মাণেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক আবদুর রহিম বলেন, ‘রেলপথ নির্মাণে প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮০ কোটি টাকা। পরে ব্যয় বেড়ে ১২৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৪ সালের জুনে কাজ শেষ হয়। রেলের ওয়াগন, সড়ক, বিদ্যুৎসহ আনুষঙ্গিক খাত মিলিয়ে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।’

অথচ বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব অবকাঠামোর বড় অংশ এখন ব্যবহারহীন। স্থলবন্দর বন্ধ হওয়ায় শুধু অবকাঠামোই নয়, রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে।

চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, পাথরবাহী একেকটি ট্রেনের চালান থেকে পাথরের পরিমাণ অনুযায়ী রেলওয়ে ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া পেত। মাসে চার-পাঁচটি মালবাহী ট্রেন চলাচল করায় মাসিক আয় দাঁড়াত প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা।

চিলাহাটি স্টেশনের সহকারী মাস্টার ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘২০২১ সাল থেকে ভারত থেকে মূলত পাথরবোঝাই ট্রেন আসত। মাসে চার থেকে পাঁচটি মালবাহী ট্রেন চলাচল করত। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেলওয়ের প্রায় ১৩ কোটি টাকা আয় হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী দুই ধরনের ট্রেনের চলাচলই বন্ধ হয়ে যায়।’

প্রশ্নের মুখে শত কোটি টাকার বিনিয়োগ

প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে আইকনিক স্টেশন ভবন এবং রেলপথসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো মিলিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি সেগুলো ব্যবহারহীন পড়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই বিপুল সরকারি বিনিয়োগের সুফল কোথায়?

স্থলবন্দর বন্ধের পর এসব অবকাঠামো সচল রাখার বিকল্প পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল কি না, ভবিষ্যতে এগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং সরকারি অর্থের এই বিনিয়োগ থেকে জনগণ কবে সুফল পাবে—এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট জবাব প্রয়োজন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, ‘চিলাহাটি স্থলবন্দরের সম্ভাবনার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। আশা করছি, ভবিষ্যতে বন্দরটি আবার চালু হবে।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের দাবি, চিলাহাটি স্থলবন্দর পুনরায় চালু হলে শুধু নীলফামারী নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরবে। একই সঙ্গে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

এখন স্থানীয়দের একটাই প্রশ্ন—কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক স্থাপনা কি এভাবেই তালাবদ্ধ পড়ে থাকবে, নাকি দ্রুত কার্যকর করে তোলা হবে চিলাহাটির সীমান্ত বাণিজ্য ও রেল যোগাযোগ?

জনগণের অর্থে নির্মিত অবকাঠামো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে না রেখে দ্রুত কার্যকর ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

 

 

খান মুহাম্মদ রাকিব 
নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি