বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে খলচরিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে যে কয়েকজন অভিনেত্রী নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন, রিনা খান তাঁদের অন্যতম। দর্শকের কাছে তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে যায় পর্দার সেই দাপুটে, কূটকৌশলী, কঠোর নারী চরিত্র—কখনও কুটনী ভাবী, কখনও দজ্জাল মা-শাশুড়ি, কখনও বা পরিবারের অশান্তির মূল হোতা।
কিন্তু অভিনয়ের অসাধারণ সাফল্য এখানেই—পর্দায় যাঁকে দেখে দর্শক রাগে-ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন, বাস্তব জীবনে সেই মানুষটিই সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর প্রকৃত নাম সেলিমা সুলতানা। ব্যক্তিজীবনে তিনি শান্ত, সাদাসিধে ও পরিবারকেন্দ্রিক একজন মানুষ। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁর ধর্মীয় অনুশীলন ও পারিবারিক জীবনযাপনের কথাও উঠে এসেছে।
‘সোহাগ মিলন’ দিয়ে চলচ্চিত্রে যাত্রা
১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সোহাগ মিলন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রিনা খানের বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে। চলচ্চিত্রে আসার পেছনে পরিচালক সুবাস দত্তের ভূমিকার কথা বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ করা হয়।
অভিষেকের পর ধীরে ধীরে তিনি নিজের জন্য এমন একটি অভিনয়ভাষা তৈরি করেন, যা বাংলা চলচ্চিত্রে খলনারী চরিত্রকে আলাদা মাত্রা দেয়। তাঁর চোখের দৃষ্টি, সংলাপ বলার ভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের মধ্যে ভয় ও কর্তৃত্ব সৃষ্টি করার ক্ষমতা তাঁকে দ্রুত দর্শকের পরিচিত মুখে পরিণত করে।
‘খলনায়িকার মহারানি’
রিনা খানের অভিনয়জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল নেতিবাচক চরিত্রকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।
পর্দায় তাঁর চরিত্র কখনও সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করেছে, কখনও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছে, কখনও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। দর্শক তাঁর চরিত্রকে ঘৃণা করেছেন—আর সেই ঘৃণাই হয়ে উঠেছে তাঁর অভিনয়দক্ষতার অন্যতম প্রমাণ।
একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, বাস্তব জীবনে কোনো কঠোর বা রাগী নারীকে দেখলেও মানুষ মজা করে তাঁকে ‘রিনা খান’ বলে তুলনা করতেন। অর্থাৎ একটি অভিনেত্রীর পর্দার চরিত্র তাঁর নামের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে সেটিই হয়ে উঠেছিল তাঁর জনপ্রিয়তার এক অনন্য নিদর্শন।
শুধু খলচরিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না
যদিও খলঅভিনেত্রী হিসেবেই তাঁর সবচেয়ে বেশি পরিচিতি, রিনা খান নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে তিনি ইতিবাচক চরিত্রেও অভিনয় করেছেন। এমনকি কয়েকটি চলচ্চিত্রে নায়িকার ভূমিকাতেও তাঁকে দেখা গেছে।
অর্থাৎ তাঁর অভিনয়জীবনকে শুধু ‘খলনায়িকা’ পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পূর্ণাঙ্গ চিত্রটি পাওয়া যায় না।
দীর্ঘ অভিনয়জীবন
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়—কোনো সূত্রে ছয় শতাধিক, আবার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আট শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম সর্বাধিক কর্মব্যস্ত ও দীর্ঘস্থায়ী অভিনেত্রী।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—
মহানায়ক — ১৯৮৪
অনন্ত ভালোবাসা — ১৯৯৯
শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ — ২০০১
আমার প্রাণের স্বামী — ২০০৭
১৬ আনা প্রেম — ২০১৭
সত্তা — ২০১৭
এছাড়াও দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য চলচ্চিত্রে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
‘সত্তা’সহ পরবর্তী সময়ের কাজ
২০১৭ সালের ‘সত্তা’ চলচ্চিত্রেও তাঁকে অভিনয় করতে দেখা যায়। পাশাপাশি ‘পড়ে না চোখের পলক’-এর মতো চলচ্চিত্রের চরিত্রও তাঁর কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়। রিনা খান নিজেই এক সাক্ষাৎকারে ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ এবং ‘পড়ে না চোখের পলক’-এর চরিত্রকে তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
পর্দার বাইরে সম্পূর্ণ অন্য এক রিনা খান
রিনা খানকে ঘিরে দর্শকের সবচেয়ে বড় বিস্ময় সম্ভবত এখানেই—পর্দায় যিনি ছিলেন ভয়ংকর, কূটকৌশলী ও কঠোর, বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন অনেক বেশি শান্ত ও পরিবারমুখী।
২০২০ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই রোজা রাখেন ও নামাজ পড়েন। একই প্রতিবেদনে তাঁকে একজন শান্ত, সাদাসিধে, মিশুক মানুষ এবং আদর্শ মা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তাঁর দুই ছেলে প্রকৌশলী এবং জার্মানিতে বসবাস করেন বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।
এই বৈপরীত্যই যেন রিনা খানকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে—পর্দার রিনা খান আর বাস্তবের সেলিমা সুলতানা যেন সম্পূর্ণ দুই ভিন্ন মানুষ।
বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর বিশেষ স্থান
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, পার্শ্ব ও খলচরিত্রের শিল্পীদের অবদানও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি চলচ্চিত্রের গল্পে দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা ও নাটকীয়তা তৈরিতে এসব চরিত্রের ভূমিকা অপরিসীম।
রিনা খান সেই কঠিন চরিত্রগুলোকে এমন স্বাভাবিকতা ও শক্তিশালী অভিনয় দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, তাঁর অভিনীত নেতিবাচক চরিত্রগুলো অনেক সময় নায়ক-নায়িকার মতোই দর্শকের মনে স্থায়ী হয়ে গেছে।
দর্শকের ভালোবাসা ও ঘৃণা—দুটিই তিনি অর্জন করেছেন অভিনয়ের শক্তিতে। আর একজন অভিনেত্রীর জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে!
আজ ২১ সেপ্টেম্বর, এই গুণী ও কিংবদন্তিতুল্য অভিনেত্রীর জন্মদিন।
জন্মদিনে রিনা খানের প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শুভকামনা।
মহান আল্লাহ তাঁকে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, শান্তি ও সুন্দর জীবন দান করুন—এই প্রার্থনা করি।
শুভ জন্মদিন, রিনা খান।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আপনার দীর্ঘ অভিনয়যাত্রা ও অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রের জন্য রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা