দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র থেকে বলিউড—তিন দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়যাত্রায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করা অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী শান্তিপ্রিয়া। তেলুগু, তামিল ও হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি টেলিভিশন ও ওয়েব সিরিজেও কাজ করেছেন তিনি। তাঁর অভিনয়জীবনের একটি বিশেষ পরিচয় হলো—বলিউডে তাঁর বিপরীতে নায়ক হিসেবে অভিষেক হয়েছিল অক্ষয় কুমারের।
শান্তিপ্রিয়ার জন্ম অন্ধ্রপ্রদেশের রাজামুন্দ্রির কাছে রঙ্গমপেটা গ্রামে এক তেলুগুভাষী পরিবারে। তাঁর বাবা পট্টাভিরামন এবং মা এম. লক্ষ্মী। পরবর্তীতে তাঁদের পরিবার চেন্নাইয়ে চলে আসে এবং সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটে।
শান্তিপ্রিয়ার বড় বোন ভানুপ্রিয়া নিজেও দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের অত্যন্ত পরিচিত অভিনেত্রী। আশির দশক থেকেই ভানুপ্রিয়া তামিল, তেলুগু ও অন্যান্য ভাষার ছবিতে সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। ফলে অভিনয়জগতের সঙ্গে শান্তিপ্রিয়ার পরিচয় ও যোগাযোগ তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রেও পারিবারিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
নৃত্যের হাত ধরে শিল্পজগতে
শৈশব থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য কুচিপুড়ি শেখেন। নৃত্যের প্রশিক্ষণ পরবর্তীকালে তাঁর অভিনয়ের অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা ও মঞ্চ-উপস্থিতিকে আরও সমৃদ্ধ করে।
অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্যশিল্পী হিসেবেও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পরবর্তী সময়ে মঞ্চেও নৃত্যনাট্যের মাধ্যমে কাজ করেছেন।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে চলচ্চিত্রে অভিষেক
১৯৮৭ সালে তেলুগু ছবি ‘Kaboye Alludu’-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন শান্তিপ্রিয়া। একই বছর ‘Enga Ooru Pattukaran’ ছবির মাধ্যমে তামিল চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক ঘটে। তামিল ছবিতে শুরুর দিকে তিনি ‘Nishanthi’ নামেও অভিনয় করেছেন।
এরপর একের পর এক তামিল ও তেলুগু ছবিতে অভিনয় করে দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরি করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য দক্ষিণী ছবির মধ্যে রয়েছে—
- এঙ্গা উরু পাট্টুকারান
- মহর্ষি
- মেহেরবান
- সিরাইল পুথা চিন্না মালার
- মেরে সাজনা সাথ নিভানা
- ফুল অউর আঙ্গার
বলিউডে অভিষেক অক্ষয় কুমারের নায়িকা হিসেবে-
১৯৯১ সালে রাজ এন. সিপ্পি পরিচালিত ‘Saugandh’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন শান্তিপ্রিয়া। ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন অক্ষয় কুমার, এবং এটিই ছিল অক্ষয় কুমারের চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিষেক। ফলে বলিউডের ইতিহাসে শান্তিপ্রিয়ার নামটি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে অক্ষয় কুমারের প্রথম নায়িকা হিসেবে।
‘Saugandh’-এ চাঁদ চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়ে। পরবর্তীতে হিন্দি ছবিতে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে—
- সৌগন্ধ (১৯৯১)
- মেরে সাজনা সাথ নিভানা (১৯৯২)
- মেহেরবান (১৯৯৩)
- ফুল অউর আঙ্গার (১৯৯৩)
- বীরতা (১৯৯৩)
- ইক্কে পে ইক্কা (১৯৯৪)
- মোহাব্বতোঁ কা সফর (১৯৯৫)
- রেশমা (১৯৯৫)
তাঁর অভিনয়জীবনের প্রথম কয়েক বছরে তিনি একাধিক ভাষায় কাজ করেন এবং দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র ও বলিউড—দুই ক্ষেত্রেই নিজের পরিচিতি তৈরি করতে সক্ষম হন।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশন
শান্তিপ্রিয়া টেলিভিশনেও অভিনয় করেছেন। পৌরাণিক ধারাবাহিক ‘Vishwamitra’-তে শকুন্তলা চরিত্রে তাঁকে দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে ‘Aryamaan – Brahmaand Ka Yodha’-সহ বিভিন্ন টেলিভিশন প্রযোজনায়ও কাজ করেছেন।
চলচ্চিত্র থেকে দীর্ঘ বিরতির মধ্যেও তিনি পুরোপুরি অভিনয়জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি; ২০০৮–২০১২ সময়কালে টেলিভিশনে তাঁর কাজের উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রেম, সংসার ও জীবনের কঠিন অধ্যায়
১৯৯২ সালে শান্তিপ্রিয়া অভিনেতা সিদ্ধার্থ রায়কে বিয়ে করেন। সিদ্ধার্থ রায় ছিলেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা ভি. শান্তারামের নাতি এবং নিজেও অভিনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিয়ের পর শান্তিপ্রিয়া ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সংসার ও সন্তানদের দিকে মনোনিবেশ করেন। নিজের একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, সেই সিদ্ধান্তটি মূলত তাঁর নিজেরই ছিল।
দাম্পত্যজীবনে তাঁদের দুই সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু ২০০৪ সালে মাত্র ৪০ বছর বয়সে হৃদ্রোগে সিদ্ধার্থ রায়ের আকস্মিক মৃত্যু হয়। এরপর দুই সন্তানকে বড় করার দায়িত্ব শান্তিপ্রিয়ার ওপর এসে পড়ে। পরবর্তী সাক্ষাৎকারগুলোতে তিনি সেই কঠিন সময়ের কথা এবং একক অভিভাবক হিসেবে সন্তানদের মানুষ করার সংগ্রামের কথা বলেছেন।
দীর্ঘ বিরতির পর প্রত্যাবর্তন
বহু বছর পর শান্তিপ্রিয়া আবার অভিনয়ে সক্রিয় হন। ‘Dharavi Bank’ (২০২২) ওয়েব সিরিজে অভিনয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তিনি আবার পরিচিত হয়ে ওঠেন।
পরবর্তী সময়ে সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘ বিরতির পর আবার কাজ করতে গিয়ে নতুন করে শুরু করার অনুভূতি হয়েছে। এখন তিনি ভিন্নধর্মী ও অর্থবহ চরিত্রে অভিনয় করতে আগ্রহী।
স্মরণীয় পরিচয়
তিন ভাষার চলচ্চিত্রে সফল অভিনেত্রী
তামিল চলচ্চিত্রে ‘নিশান্তি’ নামেও পরিচিত
অক্ষয় কুমারের প্রথম নায়িকা
দক্ষ নৃত্যশিল্পী
টেলিভিশন ও ওয়েব সিরিজের অভিনেত্রী
দীর্ঘ বিরতির পরও অভিনয়ে সফল প্রত্যাবর্তন
শান্তিপ্রিয়ার ক্যারিয়ার তাই শুধু নব্বইয়ের দশকের কয়েকটি জনপ্রিয় ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর জীবনের গল্পে রয়েছে অভিনয়ের সাফল্য, ভালোবাসা, সংসার, ব্যক্তিগত সংগ্রাম, দীর্ঘ বিরতি এবং নতুন করে ফিরে আসার এক অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়।
আপনার জীবনের প্রতিটি আগামী দিন হোক আনন্দ, সুস্থতা ও সাফল্যে পরিপূর্ণ। অভিনয়ের প্রতি আপনার ভালোবাসা এবং শিল্পীসত্তা আরও বহু বছর দর্শকদের আনন্দ দিক—এই শুভকামনা রইল।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা