মহুয়া ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের একজন অভিনেত্রী। তিনি কিশোর বয়সে নৃত্যশিল্পী ছিলেন শিপ্রা ওরফে সোনালি রায় ওরফে মহুয়া রায়চৌধুরী।
১৯৭৩ সালে তরুণ মজুমদার পরিচালিত "শ্রীমান পৃথ্বীরাজ" ছায়াছবিতে প্রথম অভিনয় করেন ৷
তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল অভিনেত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার সহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন।
১৯৮৭ সালে ৫ তম দামেস্ক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আদমি অর আওরাত (১৯৮৪) চলচ্চিত্রে তার ভূমিকার জন্য তাকে মরণোত্তর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার প্রদান করা হয়।
মহুয়া রায়চৌধুরী ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম ছিল শিপ্রা রায় চৌধুরী। পরিচালক তরুণ মজুমদার তার নাম দিয়েছেন 'মহুয়া'।
তরুণ মজুমদার তাকে আবিষ্কার করেন এবং সন্ধ্যা রায় তাকে সাজিয়ে তোলেন।
মহুয়া রায়চৌধুরী ছিলেন দমদমের একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের। তার বাবা নীলাঞ্জন রায় চৌধুরী ছিলেন একজন নৃত্যশিল্পী।
তাই ছোটবেলা থেকেই তার নাচের দক্ষতা ছিল। বয়স তখন বছর চারেক। সেই সময় থেকেই জীবন যুদ্ধের লড়াইতে সামিল হতে হয়েছিল ছটফটে শিশুটিকে। পরিবারের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে তিনি পড়াশোনা করতে পারেননি। বাবা নীলাঞ্জন রায় চৌধুরী ছিলেন উদয় শঙ্করের গ্রুপের নৃত্য শিল্পী। দমদমে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। তিনি নিজের ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। শিশুকন্যা শিপ্রা হয়ে দাঁড়াল তাঁর জীবনের বাজি জেতার তাস।
টালিগঞ্জ পাড়ায় যাতায়াত শুরু করলেন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু কোথাও সুযোগ মিলল না। সব দরজাই যেন বন্ধ। একদিন যেন ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ল। সুচিত্রা সেনের মেকআপম্যান জামাল ভাই খবর দিলেন তরুণ মজুমদার তাঁর ছবির জন্য নতুন মুখ খুঁজছেন।
এদিকে, তিনি তরুণ মজুমদারের শ্রীমন পৃথিরাজ (১৯৭২) চলচ্চিত্রে তার অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন।
তিনি ম্যাটিনি আইডল উত্তম কুমারের সাথে স্ক্রিন শেয়ার করেছিলেন সেই চোখ, বাগ বান্দি খেলা ইত্যাদির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তিনি দীপঙ্কর দে, সন্তু মুখোপাধ্যায়, সমিত ভঞ্জ, অনুপ কুমার, তাপস পাল, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, এর মতো অভিনেতাদের সাথে জুটি বেঁধে হিট চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন।
কৌশিক ব্যানার্জি, রঞ্জিত মল্লিক, প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি এমনকি কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমারের সাথে তার পাশের বাড়ির মেয়ে টাইপের অভিনয় তাকে বাঙালির ঘরে ঘরে জনপ্রিয় করে তুলেছে। অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায় তার অভিনয় দক্ষতা তৈরি করেছিলেন যা তার অভিনয় শৈলীকে আরও উন্নত করেছিল।
তার সময়ের খুব কম অভিনেত্রীই শাস্ত্রীয় এবং আধুনিক নৃত্য এতটা ভালভাবে জানতেন। মহুয়া তার চলচ্চিত্রে সফলভাবে নাচের শিল্পকে প্রবেশ করান, যা সেই সময়ে খুবই বিরল গুণ।
তিনি ২ মে ১৯৭৬ সালে অভিনেতা তিলক চক্রবর্তীকে বিয়ে করেন। কৈশোরের প্রেম। একটি পুত্র সন্তান-ও হয়। ফুটবল ভালবাসতেন। গোঁড়া ইস্টবেঙ্গল সমর্থক মহুয়া ছেলের নাম রাখলেন ‘গোলা’ তমাল রায়চৌধুরী।
অমল পালেকারের সাথে তপন সিনহার আদমি অর আওরাত - এ তার অসামান্য অভিনয় তার সমালোচকদের প্রশংসা জিতেছিল যা কেবল বক্স অফিসের কোষাগার পূরণ করার জন্য তার খ্যাতি সংশোধন করেছিল। এমনও একটা সময় ছিল যখন বাংলা ছবি চলত শুধু তার নামে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মহুয়া ব্যাপক সাফল্য ও জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৮৩ সালে লাল গোলাপ তিনি প্রায় একাই বাংলা সিনেমাকে প্রত্যাবর্তনের পথে নিয়ে গিয়েছিলেন।
১৯৮৭-তে সেই ”আদমি অউর অউরাত” ছবি দামাস্কাসে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যায়। সেরা অভিনেত্রী তিনিই। এই ছবি থেকেই একসময় তাঁকে বাদ পড়তে হচ্ছিল। ওজন বেড়ে যাওয়ার কারণে। তিনি পরিচালকের কাছ থেকে ১৪ দিন সময় চেয়ে নিয়েছিলেন। একসময় ছবি থেকে বাদ পড়তে হয়েছিল অত্যাধিক রোগা হওয়ার কারণে। ‘মোটা’ হওয়ার জন্য ছবি থেকে বাদ পড়তে হবে মানতে পারেন নি। ১৪ দিন পর এসে যখন তপন সিনহার সামনে দাঁড়ালেন চমকে গেলেন ‘আদমি অউর অউরাত’ ছবির পরিচালক।
এই জেদ তাঁর শেষ দিন অবধি বজায় ছিল।
১৯৮৬ ,১২ জুলাই আগুনের লেলিহান শিখায় ঝলসে গিয়ে ক্যালকাটা হসপিটালের বেডে। জীবনে ফেরার একলা লড়াই। ডাক্তার,পুলিশ, মিডিয়া। ফ্যান-দের উৎকন্ঠা। এগারো দিন পর এমনই এক শ্রাবণে শরীর ভর্তি দগদগে পোড়ার ক্ষত নিয়ে নিভে যান । মৃত্যুর আগে কলকাতা পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন, ‘ঘটনা শুধুমাত্র দুর্ঘটনা।’ কিন্তু তাঁর মৃত্যু রহস্য আজও ভাবায় বাঙালিকে।
১৯৮৬ ,১২ জুলাই মধ্যরাতে, মহুয়া তার বাসভবনে একটি অগ্নি দুর্ঘটনার সম্মুখীন হন, গুরুতরভাবে দগ্ধ হন এবং এগারো দিন পর ২২ জুলাই শরীর ভর্তি দগদগে পোড়ার ক্ষত নিয়ে ক্যালকাটা হসপিটালের বেডে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে কলকাতা পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন, ‘ঘটনা শুধুমাত্র দুর্ঘটনা।’ কিন্তু তাঁর মৃত্যু রহস্য আজও ভাবায় বাঙালিকে।
মৃত্যুর সময়ও তার প্রায় ১৫ টি চলচ্চিত্রে কাজ করার কথা ছিল। তার মৃত্যুর পর তার অনেক ছবি মুক্তি পায় যেমন অনুরাগের ছোয়া, প্রেম ও পাপ, অভিমান, আশির্বাদ, কেনরাম বেচারাম, আবির ইত্যাদি। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো ইন্ডাস্ট্রি শোকাহত। পুলিশ তার মৃত্যুর সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে পারেনি।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা