মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আজ সফল অভিনেতা, কৌতুকশিল্পী, গায়ক, পরিচালক ও প্রযোজক মেহমুদ-এর জন্মদিন

আজ সফল অভিনেতা, কৌতুকশিল্পী, গায়ক, পরিচালক ও প্রযোজক মেহমুদ-এর জন্মদিন

আজ সফল অভিনেতা, কৌতুকশিল্পী, গায়ক, পরিচালক ও প্রযোজক মেহমুদ-এর জন্মদিন

হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের পর্দায় উপস্থিতিই দর্শকের মুখে হাসি এনে দিত। মেহমুদ ছিলেন তাঁদেরই একজন। চলচ্চিত্র জগতে তিনি এককভাবে ‘মেহমুদ’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন সফল অভিনেতা, কৌতুকশিল্পী, গায়ক, পরিচালক ও প্রযোজক। চার দশকেরও বেশি দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ৩০০-রও বেশি হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অনন্য কৌতুকাভিনয়, অসাধারণ টাইমিং, অভিব্যক্তি এবং বিচিত্র চরিত্রায়ণ তাঁকে হিন্দি সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতায় পরিণত করেছিল। তাঁকে প্রচলিতভাবে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ‘ন্যাশনাল কমেডিয়ান’ হিসেবেও স্মরণ করা হয়।


মেহমুদের জন্ম ১৯৩২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর, বোম্বাইতে—বর্তমান মুম্বাই। তিনি জন্মেছিলেন এক শিল্পী পরিবারে। তাঁর বাবা মমতাজ আলী ছিলেন ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকের পরিচিত চলচ্চিত্র ও মঞ্চ অভিনেতা এবং নৃত্যশিল্পী। আট ভাইবোনের মধ্যে মেহমুদ ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান ও বড় ছেলে। তাঁর বোন মিনু মমতাজ নিজেও হিন্দি চলচ্চিত্রের সফল নৃত্যশিল্পী ও চরিত্রাভিনেত্রী ছিলেন এবং ছোট ভাই আনোয়ার আলী ছিলেন অভিনেতা ও প্রযোজক। মেহমুদের সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম লাকি আলী, যিনি পরবর্তীকালে জনপ্রিয় গায়ক ও সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।


শিশুশিল্পী থেকে তারকা
চলচ্চিত্রে মেহমুদের সূচনা খুব অল্প বয়সেই। ১৯৪৩ সালের কিসমত ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর পর্দায় আত্মপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু বিখ্যাত অভিনেতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পথ মোটেই সহজ ছিল না। চলচ্চিত্রে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে তাঁকে নানা ছোটখাটো কাজ করতে হয়েছে—কখনও পোলট্রি সামগ্রী বিক্রি, কখনও পরিচালক পি. এল. সন্তোষীর গাড়িচালক, আবার কখনও অন্যান্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন।
সংগ্রামের সেই দিনগুলিতে তিনি অভিনেত্রী মীনা কুমারীকে টেবিল টেনিসও শেখাতেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। মীনা কুমারীর বোন মধু-র সঙ্গে পরবর্তীকালে তাঁর বিবাহ হয়। ১৯৫৩ সালে তাঁদের বিয়ে হয় এবং তাঁদের সংসারে সন্তানও আসে। সংসারের দায়িত্ব তাঁকে অভিনয়কে পেশা হিসেবে আরও গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করতে উৎসাহিত করে।

এরপর Do Bigha Zamin, Pyaasa, C.I.D., Parvarish প্রভৃতি ছবিতে ছোট ও পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করতে করতে ধীরে ধীরে তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেন। ১৯৫৮ সালের Parvarish তাঁর ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আনে। এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।


কৌতুকাভিনয়ে এক নিজস্ব ধারা
ষাট ও সত্তরের দশকে মেহমুদ হয়ে ওঠেন হিন্দি চলচ্চিত্রের কৌতুকাভিনয়ের অন্যতম প্রধান মুখ। তাঁর অভিনয়ে ছিল চেহারার অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা, সংলাপ বলার নিজস্ব ভঙ্গি এবং পরিস্থিতিকে হাস্যরসে রূপান্তর করার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি শুধু ‘কমিক রিলিফ’ ছিলেন না; বহু ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় চরিত্রকে নিজের অভিনয়গুণে কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন।
অভিনেত্রী শুভা খোটে-র সঙ্গে তাঁর জুটি বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। Sasural, Grihasti, Bharosa, Ziddi, Love in Tokyo–এর মতো ছবিতে তাঁদের জুটি দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে। একই সঙ্গে আই. এস. জোহর ও অরুণা ইরানি-র সঙ্গেও তিনি উল্লেখযোগ্য কাজ করেন।
তাঁর স্মরণীয় ছবির তালিকায় রয়েছে—
গুমনাম (Gumnaam), প্যার কিয়ে যায় (Pyar Kiye Jaa), পড়োশন (Padosan), দিল তেরা দিওয়ানা (Dil Tera Deewana), ওয়ারিস (Waris), সাধু অর শয়তান (Sadhu Aur Shaitaan), বোম্বে টু গোয়া (Bombay To Goa), জোহর মেহমুদ ইন গোয়া (Johar-Mehmood in Goa), কুনওয়ারা বাপ (Kunwara Baap)-সহ আরও অসংখ্য চলচ্চিত্র।

 

অভিনেতার পাশাপাশি গায়কও
মেহমুদ ছিলেন বহুমুখী শিল্পী। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি গায়ক হিসেবেও নিজের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত বহু জনপ্রিয় গানের মধ্যে ‘Hum Kaale Hain To Kya Hua Dilwale Hain’, ‘Sabse Bada Rupaiyya’, ‘Ek Chatur Naar’ প্রভৃতি আজও শ্রোতাদের কাছে স্মরণীয়। তাঁর বহু ছবির গানে মন্না দে-র কণ্ঠও বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা পায়।


বিশেষ করে ১৯৬৮ সালের Padosan-এ তাঁর মাস্টার পিল্লাই চরিত্রটি হিন্দি সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় কমিক চরিত্র। ছবিটিতে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ‘এক চতুর নার’ জুগলবন্দিতে তাঁর উপস্থিতি আজও হিন্দি সিনেমার সোনালি যুগের এক অমর স্মৃতি।


পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবেও
মেহমুদ শুধু অভিনেতা হয়ে থাকতে চাননি। ১৯৬৫ সালের Bhoot Bungla দিয়ে তিনি পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন। সেই সময়ে হরর-কমেডি ঘরানাটি খুব বেশি প্রচলিত না হলেও তিনি সাহসের সঙ্গে এই ধরনের ছবি নির্মাণ করেছিলেন।
পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালের Kunwara Baap পরিচালনা করেন তিনি। ছবিটিতে হাস্যরসের পাশাপাশি পোলিও সম্পর্কে সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল। ছবিটির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে রাজেশ রোশনের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
আর ১৯৬১ সালের Chhote Nawab ছবির মাধ্যমে আর. ডি. বর্মণ প্রথমবার স্বাধীনভাবে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে বড় সুযোগ পান। অর্থাৎ মেহমুদের অবদান শুধু পর্দায় অভিনয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি পরবর্তী সময়ের বহু প্রতিভাবান শিল্পীর পথও প্রশস্ত করেছিলেন।


অমিতাভ বচ্চনের পাশে
মেহমুদের জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তরুণ শিল্পীদের প্রতি তাঁর সহায়তা। সংগ্রামের সময় অমিতাভ বচ্চনের প্রতিভায় তিনি আস্থা রেখেছিলেন। Bombay To Goa (১৯৭২)-তে অমিতাভকে প্রধান ভূমিকায় সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরবর্তীকালে এই সম্পর্কের প্রসঙ্গে অমিতাভ বচ্চন মেহমুদকে তাঁর ‘godfather’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।


পুরস্কার ও স্বীকৃতি
মেহমুদের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্বীকৃতি এসেছে ফিল্মফেয়ার পুরস্কারেও। তাঁকে মোট ২৫ বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি মনোনয়ন ছিল কৌতুকাভিনয়ের বিভাগে এবং ৬টি ছিল পার্শ্বচরিত্রের অভিনয়ের জন্য।


ফিল্মফেয়ারের সরকারি তালিকা অনুযায়ী তিনি চারবার পুরস্কার জয় করেন—
বেস্ট সাপোর্টিং অ্যাক্টর — দিল তেরা দিওয়ানা
বেস্ট কমেডিয়ান — প্যায়ার কিয়ে যা
বেস্ট কমেডিয়ান — ওয়ারিস
বেস্ট কমেডিয়ান — বরদান


শেষ অধ্যায়
দীর্ঘ ও বর্ণময় চলচ্চিত্রজীবনের পর ২৩ জুলাই ২০০৪ সালে, ৭১ বছর বয়সে, যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ডানমোরে তাঁর মৃত্যু হয়। হৃদ্‌রোগজনিত শারীরিক সমস্যার চিকিৎসার জন্য তিনি সেখানে গিয়েছিলেন এবং ঘুমের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে মুম্বাইয়ের মেহবুব স্টুডিওতে তাঁর ভক্ত ও সহকর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।


মেহমুদের চলে যাওয়ার সঙ্গে হিন্দি চলচ্চিত্রের এক স্বর্ণযুগের অনন্য হাসির শিল্পীরও বিদায় ঘটে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—একজন পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতাও কখনও কখনও পুরো ছবির স্মৃতি হয়ে উঠতে পারেন। তাঁর সংলাপ, মুখভঙ্গি, গান, চরিত্র এবং অমলিন হাস্যরস আজও পুরনো হিন্দি সিনেমার দর্শকদের মনে সমানভাবে জীবন্ত।
মেহমুদ আজও স্মরণীয়—

হাসির আড়ালে এক সংগ্রামী শিল্পী,
অভিনয়ের আড়ালে এক বহুমুখী প্রতিভা,
আর ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম।
জন্মবার্ষিকীতে এই মহান শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা