হঠাৎ কিছুটা এগিয়ে থেমে গেল ট্যাক্সি।
চালকের আসনে বসা এক শিখ ভদ্রলোক বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন—
“আপনি কি সিঙ্গার মান্না দে?”
ট্যাক্সিতে বসে ছিলেন স্বয়ং মান্না দে আর তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।
সেদিন স্টুডিওতে রেকর্ডিং শেষ করে তাঁরা বাড়ি ফিরছিলেন। নিজের গাড়ি না থাকায় সাধারণ ট্যাক্সিতেই চেপেছিলেন।
মনের আনন্দে মান্না দে ট্যাক্সির ভিতর গুনগুন করে গাইছিলেন প্রিয় কোনো সুর।
অজান্তেই তাঁর সেই সুর পৌঁছে যায় ট্যাক্সিচালকের কানে।
একসময় ট্যাক্সি থেমে যায়। সর্দারজি ড্রাইভার বলেন,
“সাহেব, আপনি নিশ্চয়ই মান্না দে! কারণ আপনি যেমনভাবে গান গাইলেন, সেইভাবে গাওয়া একমাত্র মান্না দে’ই পারেন।”
হেসে ফেললেন মান্না দে ও পুলকবাবু।
চালকের চোখে যে মুগ্ধতা, তা আর লুকিয়ে রাখা যায় না।
সর্দারজি অনুরোধ করলেন—
“আমার বাড়ি কাছেই, একবার যদি আপনি পা রাখেন, আমাদের জীবন ধন্য হবে।”
এমন আন্তরিক অনুরোধ কে-ই বা ফেরাতে পারেন!
মান্না দে গেলেন তাঁর ছোট্ট ঘরে, সাদামাটা আপ্যায়নে চা খেলেন।
বাড়ির লোকজনের অনুরোধে গাইলেন কয়েকটি পাঞ্জাবি গান, সেদিন সেখানেই যেন তৈরি হলো এক অনন্য সুরের বন্ধন।
বিদায়ের সময় ট্যাক্সিচালক ভদ্রলোক মান্না দে’র দেওয়া ভাড়া নিতে অস্বীকার করলেন—
“আপনি আমাদের ঘরে এসেছেন, এর চেয়ে বড় আশীর্বাদ আর কী হতে পারে!”
এই ঘটনাটি কিংবদন্তি শিল্পী পরবর্তীতে তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের জলসাঘরে’ বইয়ে লিখে রেখেছিলেন—
মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সঙ্গীতের জাদু কীভাবে এক সাধারণ ট্যাক্সির ভেতরেও জন্ম নিতে পারে, সেই অকৃত্রিম মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিলেন তিনি নিজেই।
আজ সেই অনুপম সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে’র প্রয়াণ দিবস।
বাংলা ও হিন্দি গানের জগতে তাঁর কণ্ঠ এক অমর সম্পদ, এক চিরন্তন প্রেরণা।
তাঁর গাওয়া— “কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই”, “এই পথ যদি না শেষ হয়”, “জীবন খাতায় পাতা পাতা”, “লাগে না মন”— আজও আমাদের জীবনের সুরে বেজে ওঠে।
অন্তর থেকে শ্রদ্ধা কিংবদন্তি মান্না দে’কে।
তাঁর গানেই বেঁচে থাকুক আমাদের অনুভব, স্মৃতি আর ভালোবাসা।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা