পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই যুগে যুগে মনীষীদের জন্ম হয়েছে, যাঁদের সৃষ্টিশীলতা, দিকনির্দেশনা ও অবদান মানবসভ্যতাকে আলোকিত করেছে। বাংলাদেশও তেমন মনীষীদের জন্মভূমি— তাঁদের হাত ধরেই আমরা পেয়েছি আলোকিত জাতিসত্তা, সমৃদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতি ও চিন্তার স্বাধীনতা।
তেমনই এক প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ কণ্ঠস্বর, আধুনিক বাংলা কবিতার নাগরিক কবি — কবি শামসুর রাহমান।
১৯২৯ সালের ২৪ অক্টোবর (কিছু সূত্রে ২৪ অক্টোবর) ঢাকার মহুতটুলীতে জন্ম নেন কবি। তাঁর পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরার পাড়াতলী গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর।
১৯ বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করেন শামসুর রাহমান। ১৯৫০ সালে তাঁর প্রথম কবিতা “উনিশ বছর” প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে তিনি হয়ে ওঠেন আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান কণ্ঠ।
তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন দীর্ঘকাল— দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা— এসব পত্রিকায় সম্পাদকীয় পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ‘মজলুম আদিব’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন, যা ছিল স্বাধীনতার আহ্বান, প্রতিরোধের কণ্ঠ।
উল্লেখযোগ্য রচনা ও অবদান:
দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি লিখেছেন—
৬৬টি কাব্যগ্রন্থ
৪টি উপন্যাস
১টি প্রবন্ধগ্রন্থ
১টি ছড়ার বই
৬টি অনুবাদগ্রন্থ
তাঁর বিখ্যাত কবিতার মধ্যে—
‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’, ‘বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’— ইত্যাদি আজও হৃদয়ে গেঁথে থাকা বাঙালির অনুপ্রেরণার কবিতা।
কবি টোকন ঠাকুরের ভাষায়,
“বাংলা কবিতা ও বাংলা ভাষা— দুটোই শামসুর রাহমানের কাছে নানাভাবে ঋণী।”
পুরস্কার ও সম্মাননা:
বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন —
বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৯)
একুশে পদক (১৯৭৮)
স্বাধীনতা পদক (১৯৯১)
আনন্দ পুরস্কার (১৯৮২)
এছাড়াও দেশ-বিদেশের অসংখ্য সাহিত্য সম্মাননা তাঁর ঝুলিতে রয়েছে।
১৯৫৫ সালের ৮ জুলাই তিনি বিবাহ করেন জোহরা বেগমকে। তাঁদের তিন কন্যা ও দুই পুত্র — সুমায়রা আমিন, ফাইয়াজ রাহমান, ফাওজিয়া সাবেরিন, ওয়াহিদুর রাহমান মতিন ও শেবা রাহমান।
২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এই মহীরুহ ঢাকায় পরলোকগমন করেন। তবে তাঁর কবিতা আজও আমাদের ভাষা, চেতনা ও স্বাধীনতার অনিবার্য অংশ।✨
কবি শামসুর রাহমান বেঁচে আছেন তাঁর কবিতায়, আমাদের মগজে, আমাদের মুক্ত চিন্তায়।
তিনি ছিলেন আলোর দিশারি — নাগরিক চেতনার কবি, মানবিকতার কবি, স্বাধীনতার কবি।
আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি বাংলা কবিতার এই মহৎ প্রতিভাকে।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা