বাংলা সঙ্গীতভুবনে উচ্চাঙ্গ বা ধ্রুপদী সঙ্গীত এক জটিল, গভীর ও বিশুদ্ধ সাধনার ক্ষেত্র। এই কঠিন শাখার শিল্পী খুব বেশি নেই— কিন্তু যাঁরা আছেন, তাঁদের মধ্যে ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী এক অনন্য নাম, এক নীরব কিংবদন্তি।
তিনি কেবল গান গাওয়া মানুষ নন, তিনি সুরের সাধক— যিনি আজীবন ধ্রুপদী সঙ্গীতকে জীবনের ধর্ম হিসেবে লালন করেছেন।
নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর জন্ম ১৯৫২ সালের ২৫ অক্টোবর, নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার খৈনকুট গ্রামে।
শৈশব কেটেছে গ্রামে, তবে বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তিনি ১৯৬৭ সালে বকশি বাজারের নবকুমার ইনস্টিটিউট থেকে এসএসসি, ১৯৬৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে কিছুদিন লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সঙ্গীতই হয়ে ওঠে তাঁর আজীবনের ঠিকানা।
ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী ধ্রুপদী সঙ্গীতের অন্যতম ধারক ও বাহক পাতিয়ালা ঘরানা থেকে
তালিম নিয়েছেন দুই মহান গুরু—
ওস্তাদ আমানত আলী খান ও ওস্তাদ ফতেহ আলী খান-এর কাছে।
তাঁর কণ্ঠ ও সাধনায় সেই পাতিয়ালা ঘরানার গভীরতা আজও স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রতিটি আলাপ ও বোল-তানে।
নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী প্রথম টেলিভিশনে গান করেন ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘আমার যত গান’-এ, উপস্থাপক ছিলেন ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল।
এরও আগে ১৯৭৯ সালে তিনি প্রথম বিদেশে (মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে) গান পরিবেশন করেন।
এরপর একে একে তিনি গান শুনিয়েছেন সারা বিশ্বে — লন্ডন, টরোন্টো, দুবাই, দিল্লি, কলকাতা, কুয়ালালামপুরে, যেখানেই বাংলা গানপ্রেমী মানুষ আছে, সেখানেই তাঁর সুরের জাদু ছুঁয়ে গেছে শ্রোতার হৃদয়।
তিনি ঠুমরি, খেয়াল, গজল, ধ্রুপদ, রাগপ্রধান সব ধারাতেই সমান দক্ষ।
তাঁর কণ্ঠে “আজ প্রেমের দিন”, “সাঁঝের আলোয় আমার মনের গান” কিংবা “রাগের ছোঁয়ায় অনুরণিত প্রভাত”— সবই হয়ে ওঠে এক গভীর আত্মমগ্ন সুরসাধনা।
পারিবারিক জীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক —
ছেলে ফাইয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী ও মেয়ে মেহনাজ চৌধুরী বারখা,
যাঁরা পেশাদার শিল্পী না হলেও বাবার মতোই সঙ্গীতপ্রেমী ও সুরসচেতন।
স্ত্রী সাবরা নিয়াজও সঙ্গীত পরিবারের সন্তান; তাঁর পিতা সৈয়দ জাকির হোসেন ছিলেন উপমহাদেশের বিশিষ্ট সুরকার ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের গুরু।
ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী সবসময় প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেছেন। খ্যাতির চূড়ায় উঠতে পারতেন, কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন নিভৃত সুরসাধনা—
যেখানে গানই ধ্যান, সঙ্গীতই সাধনা, এবং শ্রোতাই তাঁর আত্মিক সঙ্গী।
বাংলা সঙ্গীতাঙ্গনের ইতিহাসে তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি—
যিনি শুদ্ধ সঙ্গীতের প্রতি অকৃত্রিম নিষ্ঠা, নম্রতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, শিল্প মানে খ্যাতি নয়, শিল্প মানে সাধনা।
আজ এই দিনে আমাদের একান্ত প্রার্থনা—
ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী যেন আরও দীর্ঘদিন সুস্থ থাকেন,
আরও সুরে, আরও গানে আমাদের জীবনকে আলোকিত করে রাখেন।জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অন্তরের অভিনন্দন।
বাংলা সঙ্গীতের আকাশে তাঁর সুরের তারা যেন চিরদিন জ্বলে থাকে।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা