বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বাউফলে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ, অতিরিক্ত টাকা যাচ্ছে কার পকেটে?

বাউফলে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ, অতিরিক্ত টাকা যাচ্ছে কার পকেটে?

বাউফলে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ, অতিরিক্ত টাকা যাচ্ছে কার পকেটে?

একই বিল দুইবার, পরিশোধিত বিল ফের দাবি; অভিযোগ অস্বীকার কর্তৃপক্ষের

মোঃ রুবেল হোসেন, বাউফল (পটুয়াখালী)

পটুয়াখালীর বাউফলে পল্লী বিদ্যুতের বিল নিয়ে একের পর এক অভিযোগ তুলছেন গ্রাহকরা। কারও অভিযোগ, মিল বন্ধ থাকার পরও এসেছে ২৫ হাজার টাকার বিল। কারও দাবি, পরিশোধিত বিল আবারও নতুন বিলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আবার কোনো গ্রাহকের একই মাসে একই বিল দুইবার ইস্যু করার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় অতিরিক্ত বিলের হিসাব ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে গ্রাহকদের মধ্যে। তাঁদের প্রশ্ন—বিদ্যুতের সরবরাহে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং থাকলেও বিল বেশি আসছে কেন? আর ভুল বিলের টাকা পরিশোধ করা হলে সেই অর্থের হিসাব কীভাবে রাখা হচ্ছে?

মিল বন্ধ, তবু তিন মাসের বিল ২৫ হাজার টাকা

বাউফলের একটি ছ-মিলে প্রায় চার মাস আগে নতুন মিটার স্থাপন করে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ওই মিলের তিন মাসের বিদ্যুৎ বিল ইস্যু করা হয় ২৫ হাজার টাকা। মিলটি অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকায় বিলের পরিমাণ নিয়ে সন্দেহ হয় মালিক আবু হানিফের।

বিষয়টি নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করলে তাঁকে নির্ধারিত বিল পরিশোধ করতে বলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে সন্দেহের কারণে তিনি দেশ রূপান্তরের বাউফল প্রতিনিধির শরণাপন্ন হন।

বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হিসাব যাচাই করতে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের বিলের সঙ্গে প্রায় ৬০০ ইউনিট অতিরিক্ত হিসাব করা হয়েছে বলে জানান। পরে ভুল স্বীকার করে পরবর্তী মাসের বিলের সঙ্গে তা সমন্বয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় গ্রাহকদের প্রশ্ন, বিল যাচাই করে অতিরিক্ত ইউনিটের হিসাব ধরা না পড়লে ওই টাকা পরিশোধ করতে হতো কি না? একইভাবে অন্য গ্রাহকদের বিলেও এমন ভুল হচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

পরিশোধিত বিল আবারও যুক্ত করার অভিযোগ

নাঈম তালুকদার নামের আরেক গ্রাহক জানান, ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে তাঁর বিদ্যুৎ বিল আসে ৪২০ টাকা। কিন্তু ওই বিলের সঙ্গে ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের একটি বিল যুক্ত করে মোট ৬১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

তাঁর দাবি, ২০১৯ সালের ওই বিলের পরিমাণ ছিল ৫৫৭ টাকা এবং সেটি আগেই পরিশোধ করা হয়েছিল। পুরোনো বিলের কপি খুঁজে না পেলে তাঁকে আবারও ওই টাকা পরিশোধ করতে হতে পারত বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

নাঈমের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের বছরের পরিশোধিত বিলের কপি খুঁজে পাওয়ার পর সেটি নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করেন তিনি। পরে কর্তৃপক্ষ ভুল স্বীকার করলে ৪২০ টাকা পরিশোধ করে বিষয়টি থেকে অব্যাহতি পান।

এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, পরিশোধিত বিলের তথ্য যাচাই না করেই কীভাবে তা নতুন বিলের সঙ্গে যুক্ত হলো? গ্রাহকের কাছে আগের বিলের কপি না থাকলে তাঁকে কি একই বিলের টাকা আবারও দিতে হতো?

২০১৬ সালের বিল যুক্ত হয়েছে ২০২৬ সালের বিলে

কামরুল হাসান নামের আরেক গ্রাহক জানান, তিনি ২০২১ সাল থেকে একটি ভাড়া দোকানে ব্যবসা করছেন। হঠাৎ গত মাসের বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে ২০১৬ সালের ৫ হাজার ৯০০ টাকার একটি বিল যুক্ত করা হয়।

এ বিষয়ে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁকে ওই বিল পরিশোধ করতে বলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। অন্যথায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও তাঁর দাবি।

ঘটনাটি নিয়ে বাউফল পল্লী বিদ্যুতের উপমহাব্যবস্থাপকের (ডিজিএম) কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ জানান কামরুল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজিএম তাঁকে পুরো টাকা পরিশোধ করতে বলেন এবং এ বিষয়ে আর কথা হবে না বলে জানান।

তবে ২০১৬ সালের বিল ২০২৬ সালের বিলে যুক্ত হওয়ার কারণ এবং বিলটি আগে কেন দাবি করা হয়নি, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

একই মাসে একই বিল দুইবার ইস্যুর অভিযোগ

জিএম মশিউর রহমান মিলন নামের এক গ্রাহক জানান, তাঁর বসতবাড়ির একই মিটারের বিপরীতে এক মাসে দুটি বিল ইস্যু করা হয়। তিনি খেয়াল না করেই বিল দুটি একসঙ্গে পরিশোধ করেন। পরে যাচাই করে দেখতে পান, একই বিল দুইবার করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে অফিসে যোগাযোগ করলে পরবর্তী মাসের বিলের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে তাঁর অভিযোগ, চার মাস পেরিয়ে গেলেও সেই অর্থ সমন্বয় করা হয়নি।

মেহেদি হাসান নামের আরেক গ্রাহকের দাবি, অ্যানালগ মিটার ব্যবহারের সময় এ ধরনের সমস্যা তুলনামূলক কম ছিল। ডিজিটাল মিটার চালুর পর থেকে বিল নিয়ে নানা সমস্যা বেশি চোখে পড়ছে বলে তিনি মনে করেন।

লোডশেডিংয়ের মধ্যেও বেশি বিল কেন?

পল্লী বিদ্যুতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাউফল উপজেলায় মোট গ্রাহকসংখ্যা ৭৫ হাজার ৩৯। উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ থেকে ২০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ হচ্ছে সাড়ে ৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০ মেগাওয়াট। ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গ্রাহকদের প্রশ্ন, বিদ্যুতের সরবরাহ কম থাকার পরও বিল বেশি আসছে কেন? তাঁদের দাবি, আগে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় যে বিল আসত, বর্তমানে তার চেয়ে দেড় থেকে দুই গুণ বা তারও বেশি বিল আসছে।

তবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি ও বিল বৃদ্ধির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট মিটারের রিডিং, ব্যবহৃত ইউনিট, বিলের হিসাব এবং সরবরাহের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এ বিষয়ে বাউফল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, “অনুমতি ছাড়া তো আমরা বক্তব্য দিতে পারি না। কোনো বিষয়ে জানার থাকলে আমাকে লিখিতভাবে জানান। আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আপনার লিখিত অভিযোগের জবাব দেব।”

পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আবুল কাশেম বলেন, “কোনো বিল ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করে সঠিক বিল করার কথা। বিলের কপি নিয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসে আসতে বলেন, সংশোধন করে দেওয়া হবে।”

অতিরিক্ত বিলের টাকা কোথায় যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যদি ভুলবশত এরকম হয়ে থাকে, তবে বিলের টাকা গ্রাহকের নিজের অ্যাকাউন্টে জমা থাকছে।”

২০১৬ সালের বিল ২০২৬ সালের অক্টোবরে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা আসলে না দেখে বলা যাবে না।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, কারও অতিরিক্ত বিল হচ্ছে না এবং কোনো বিল নিয়ে সন্দেহ থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করলে তা সংশোধন করে দেওয়া হবে।

গ্রাহকদের প্রত্যাশা

একই বিল একাধিকবার ইস্যু, পরিশোধিত বিল পুনরায় দাবি এবং অতিরিক্ত ইউনিট গণনার অভিযোগগুলো নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন গ্রাহকরা। তাঁদের মতে, প্রতিটি বিলের রিডিং ও হিসাব যাচাই, আগের পরিশোধের তথ্য সংরক্ষণ এবং ভুল বিল দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত ভুলের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি গ্রাহকদের অর্থের সঠিক হিসাব নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ভোগান্তি কমানোও সহজ হবে।

প্রশ্ন রয়ে যায়—বিলের ভুলগুলো কি নিছক হিসাবের গরমিল, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও কোনো কারণ? অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তই দিতে পারে এর সঠিক উত্তর।