যিনি একাধারে মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে নিজের অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকহৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন।
তাঁর পুরো নাম কাজী মাহফুজুল হক।
জন্ম ১৯২৯ সালের ১৫ মে ফরিদপুরে, তবে তাঁদের আদি নিবাস চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে।
পিতা খান বাহাদুর আলহাজ মাওলানা মোহাম্মদ খবিরুল হক ছিলেন ফরিদপুরের প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট।
শিক্ষাজীবনে মেহফুজ ফরিদপুর, কুমিল্লা ও কিছুদিন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন।
ছোটবেলা থেকেই নাটক, গান ও অভিনয়ের প্রতি গভীর টান ছিল তাঁর।
তরুণ বয়সে তিনি দক্ষিণ সন্দ্বীপে একটি নাট্যদল গঠন করেন এবং সেখানে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘টিপু সুলতান’, ‘দিলাল রাজা’ প্রভৃতি নাটকে অভিনয় করে স্থানীয়ভাবে সুনাম অর্জন করেন।
১৯৫৩ সালে ঢাকায় আসার পর তিনি নিয়মিত মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন এবং পরবর্তীতে বেতারে নাট্যশিল্পী হিসেবে যোগ দেন।
তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ও অভিব্যক্তিপূর্ণ সংলাপ উচ্চারণ তাঁকে অচিরেই পরিচিত মুখে পরিণত করে।
১৯৬১ সালে সালাহউদ্দীন পরিচালিত ‘যে নদী মরুপথে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি সিনেমায় প্রবেশ করেন।
এরপর একে একে তিনি অভিনয় করেন শতাধিক চলচ্চিত্রে —
যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
তালাশ, মিলন, দরশন, আখেরী স্টেশন, চাওয়া-পাওয়া, আলীবাবা, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মোমের আলো, অঙ্গার, বধূ বিদায়, নাচের পুতুল, প্রতিশোধ, মনের মানুষ, ওরা ১১ জন, চন্দ্রলেখা, স্বামীর ঘর, ছোট বউ প্রভৃতি।
প্রথম দিকে তিনি নায়ক চরিত্রে অভিনয় করলেও দ্রুতই দর্শকপ্রিয় হয়ে ওঠেন তাঁর খলচরিত্রে বাস্তবধর্মী অভিনয়ের জন্য।
তাঁর সেই শক্তিশালী সংলাপ, মঞ্চনির্ভর গাম্ভীর্য ও চোখের অভিব্যক্তি তাঁকে করে তোলে বাংলা চলচ্চিত্রের এক অমলিন খলনায়ক।
পরবর্তীকালে তিনি চরিত্রাভিনেতা হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন —
জমিদার, দরদি পিতা, কিংবা ধর্মভীরু সমাজনেতা—প্রতিটি চরিত্রেই ছিলেন অনবদ্য।
বেতার ও টেলিভিশন নাটকেও তাঁর উপস্থিতি ছিল সমান উজ্জ্বল।
“এই সব দিন রাত্রি”র দাদু:
বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘এই সব দিন রাত্রি’-তে তাঁর অভিনীত ‘দাদু’ চরিত্রটি আজও দর্শকদের মনে অমর হয়ে আছে।
সেই হাস্যরস, সংযম আর বাস্তব অভিনয় তাঁকে পৌঁছে দেয় নতুন উচ্চতায়।
মেহফুজ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মুনীরা বেগমের সঙ্গে।
তাঁদের পাঁচ সন্তান — তিন মেয়ে চান্দা, তারা ও চুমকি, দুই ছেলে আরমান ও নোমান।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন নরম স্বভাবের, ধর্মপরায়ণ ও পরিবারপ্রেমী মানুষ।
২ নভেম্বর ২০০৫ — বাংলা চলচ্চিত্র হারায় এক বলিষ্ঠ কণ্ঠ, এক প্রতিভাধর শিল্পীকে।
তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে দীর্ঘ কর্মজীবনের মাধ্যমে মেহফুজ হয়ে আছেন বাংলাদেশের অভিনয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।তাঁর স্মৃতি, তাঁর অভিনয় — আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকবে চিরকাল।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা
