ইরান যুদ্ধের এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর সংস্থাগুলোর বিশাল ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে। আর এই গোয়েন্দা ভুল ইরাক যুদ্ধের গোয়েন্দা ভুলকেও হার মানিয়েছে। ইসরায়েলের হাইফা ও তেল আবিবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত আঘাত এবং ব্যাপক প্রাণহানি প্রমাণ করছে, তেহরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল একেবারেই সেকেলে ও ত্রুটিপূর্ণ। মার্কিন গোয়েন্দারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা অন্তত এক হাজারটি কম গণনা করেছিল, যার ফলে যুদ্ধের ময়দানে মার্কিন ও তার মিত্ররা এখন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
পেন্টাগন এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দাবি করেছিল, মার্কিন হামলায় ইরানের এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরান কেবল তার সক্ষমতা টিকিয়েই রাখেনি বরং পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্রকে হতবাক করে দিচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের 'আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি'র ক্ষেপণাস্ত্র শহরগুলো শনাক্ত করতে না পারা গোয়েন্দা ব্যর্থতার এক নতুন নজির সৃষ্টি করেছে। উত্তর কোরিয়ার প্রকৌশলীদের সহায়তায় নির্মিত এসব সুড়ঙ্গ ও গোপন ডিপো মার্কিন স্যাটেলাইট এবং নজরদারি ব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে গেছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা (রেঞ্জ) নিয়েও মার্কিন হিসাব ছিল মারাত্মক ভুল। ওবামা প্রশাসনের সময় থেকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ক্ষেপণাস্ত্রের সীমা ১৮৬৪ মাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে প্রচার করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি দিয়েগো গার্সিয়ায় ইরানের দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণ প্রমাণ করেছে, মার্কিন অনুমান বাস্তবতার চেয়ে অন্তত ৫০ শতাংশ কম ছিল। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন অনেক বেশি দূরপাল্লার এবং আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
যুদ্ধক্ষেত্রে এই বিপর্যয়ের ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে ব্যর্থ হওয়া এবং জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম ট্রাম্প প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কড়া ভাষায় দেওয়া হুমকিগুলো থেকে বোঝা যায় যে, ইরানের নিরবচ্ছিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে মার্কিন কৌশল কাজ করছে না। তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে চরম হুঁশিয়ারি দিলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০০৬ সালের ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে পেন্টাগন। সেই সময় উত্তর কোরিয়ার সহায়তায় হিজবুল্লাহ যেভাবে সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, ইরান সেই একই কৌশলকে আরও আধুনিক ও বিস্তৃত রূপ দিয়েছে। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অহংকার এবং হিজবুল্লাহর সেই পুরনো কৌশলকে অবজ্ঞা করার কারণেই আজ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ইরানি ড্রোনে ছেয়ে গেছে। কাতার ও ওমানের মতো বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর শিল্প স্থাপনায় ইরানের আঘাত হানার সক্ষমতাও আগে থেকে আঁচ করতে পারেনি ওয়াশিংটন।
ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনের হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে বলে যে গোয়েন্দা ভুল হয়েছিল, এবারের চিত্র তার ঠিক উল্টো। বুশ প্রশাসন বিপদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখিয়েছিল, আর এখনকার গোয়েন্দারা ইরানের বিপদের মাত্রা অনেক কমিয়ে দেখিয়েছে। বিশেষ করে ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি এবং সিআইএ-র ভেতরে থাকা রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতা ও তথ্যের ভুল বিশ্লেষণ এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আরব নিরাপত্তা অবকাঠামোগুলো ইরানের নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রের মুখে চরম হুমকির মুখে। ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলো যারা ইরানের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ছিল, তারাও এখন নিজেদের শিল্পাঞ্চল রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কেন এই কৌশলগত পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারেনি, তা নিয়ে এখন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে গোয়েন্দাদের ব্যর্থতা ঢাকতে এখন পারস্পরিক দোষারোপের পালা চলছে।
