সাতকানিয়ায় টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার প্রায় ৬ দিন পর সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে, বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। কৃষি, মৎস্য ও সড়ক খাত মিলিয়ে ৭৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় সড়ক, কালভার্ট, স্লুইস গেট, কৃষিজমি, মাছের খামার ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
সাতকানিয়া- বাজালিয়া সাঙ্গু নদীর পাড় ভাঙ্গন ও
পৌরসভার উত্তর রামপুর, হাঙরমুখ, গাটিয়াডেঙ্গা ও সামিয়ারপাড়া এলাকায় ডলু নদীর ভাঙনে প্রায় ১০০ মিটার সড়ক বিলীন হয়ে গেছে। ওই ভাঙা অংশ দিয়ে এখনো নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। ফলে, এসব এলাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। নলুয়া-চৌধুরীহাট সড়কের একটি অংশও নদীগর্ভে চলে গেছে।
সাঙ্গু নদীর ভাঙনে বাজালিয়া ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া এলাকায় কয়েকটি বসতঘর, একটি মসজিদ ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছদাহা-দস্তিদারহাট সড়কের প্রায় ২০০ মিটার অংশও বন্যার তোড়ে বিলীন হয়েছে।
উত্তর রামপুর এলাকার বাসিন্দা জিসানুল ইসলাম বলেন, ‘বায়তুশ শরফ এলাকায় ডলু নদীর পানি ঢুকে গোলারঘাট সড়কের বড় একটি অংশ ভেঙে গেছে। এখনও ওই অংশ দিয়ে তীব্র স্রোতে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানির তোড়ে অটোরিকশাচালক নাছির মৌলভীর বাড়িটিও ভেঙে গেছে।
বিশেষ করে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি খাত। উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক তথ্যমতে, ৬০ হেক্টর আমনের বীজতলা, ৯৯৫ হেক্টর আউশ ধান, ৭৪০ হেক্টর শাকসবজি, ৮ হেক্টর পান, ১৬ হেক্টর পেঁপে বাগান এবং ৮০ হেক্টর অন্যান্য ফসলসহ মোট ১ হাজার ৮৯৯ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ২০ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কৃষি খাতে প্রাথমিকভাবে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বাজালিয়া ইউনিয়নের মাহালিয়া বিল এলাকার সবজি চাষি সিরাজ মিয়া জানান, দেড়শ শতক জমিতে করলা, লাউ, শসা, ঝিঙে, ঢেঁড়স ও বেগুনের আবাদ করেছিলেন। কিন্তু বন্যার পানিতে কোনো ফসল রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
সাতকানিয়া উপজেলার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৮৯৯ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা ও সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে।
অন্যদিকে উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) জানিয়েছে, বন্যায় ২৬টি সড়কের প্রায় ১৩ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, ৪ টি কালভার্ট ও ১ টি স্লুইস গেট ভেঙে গেছে। এসব অবকাঠামোর প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা।এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে বলেন, ‘অনেক এলাকায় এখনও পানি পুরোপুরি নামেনি। ফলে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। পানি নেমে গেলে পূর্ণাঙ্গ জরিপের মাধ্যমে চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণ করে জানানো হবে। তবে ব্যাপক সড়কের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলার মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ৫৭৫ হেক্টর আয়তনের তিন হাজার ৫৫০টি পুকুর ও দিঘি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে ৮০৬ মেট্রিক টন পিন ফিস, প্রায় ১০ লাখ মাছের পোনা এবং বিপুল পরিমাণ চাষের মাছ ভেসে গেছে। এতে অবকাঠামো, মাছ ও পোনাসহ প্রায় ৩৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন পানি পুরোপুরি নেমে গেলে পুনরায় মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করে, ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তার জন্য সুপারিশ করা হবে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দ্রুত সময়ে মেরামতের কাজ আরম্ভ করবেন।
মোঃ কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ প্রতিনিধি।
