বাংলাদেশের মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের এক নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী ছিলেন আবদুর রাতিন। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ডাবিং শিল্পী, সহকারী পরিচালক এবং সংস্কৃতিসেবী। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়ের প্রতিটি মাধ্যমে তিনি রেখে গেছেন নিজস্ব স্বাক্ষর। স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়, প্রাণবন্ত সংলাপ এবং চরিত্রের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য তিনি দর্শকদের কাছে আজও স্মরণীয়।
১৯৫২ সালের ১৩ জুলাই পুরান ঢাকার নারিন্দায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের বর্ষীয়ান অভিনেতা আব্দুল মতিন, আর মাতা আয়েশা খাতুন। ১৫ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তাঁর ছোট ভাই অঞ্জন রহমান একজন সংস্কৃতিকর্মী ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
শৈশবে ছিলেন দুরন্ত ও সাহসী। বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে চলন্ত ট্রেনে উঠে পড়া, টিকিট ছাড়াই গেন্ডারিয়া-তেজগাঁও-নারায়ণগঞ্জ লাইনে ট্রেন ভ্রমণ কিংবা স্কুল ফাঁকি দিয়ে নানা রোমাঞ্চে মেতে ওঠা—এসব ছিল তাঁর কৈশোরের স্মরণীয় অধ্যায়। তবে সেই দুরন্ত ছেলেটিই পরবর্তীতে লেখাপড়ায় মনোযোগী হয়ে গ্র্যাজুয়েট হাই স্কুল থেকে এসএসসি, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে এইচএসসি এবং জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
অভিনয় যেন ছিল তাঁর রক্তে। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে পরিচালক মোস্তফা মেহমুদ নির্মিত ‘নতুন প্রভাত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। এরপর তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের একজন নির্ভরযোগ্য চরিত্রাভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র-
দেবদাস, হারানো সুর, শুকতারা, জবাব চাই, স্নেহের প্রতিদান, চোরের বউ, মহান বন্ধু, লালু সর্দার, স্বার্থপর—সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রায় শতাধিক মঞ্চনাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি অসংখ্য নাটক ও ধারাবাহিকে তাঁর অনবদ্য উপস্থিতি আজও দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন।
উল্লেখযোগ্য নাটক-
সোজন বাদিয়ার ঘাট, সকাল সন্ধ্যা, রত্নদ্বীপ, মনিহার, স্বপ্নবিলাস, গৃহবাসী, মহুয়ার মন, অস্থির পাখিরা, পরের জায়গা পরের জমি, তেমনই আছি এবং হীরামন ধারাবাহিকের একাধিক পর্বে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ ডাবিং শিল্পী। বাংলা চলচ্চিত্রের বহু জনপ্রিয় অভিনেতার কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। এছাড়া কিংবদন্তি অভিনেতা ও পরিচালক সৈয়দ হাসান ইমাম-এর সহকারী পরিচালক হিসেবে ‘লাল সবুজের পালা’, *‘অবিচার’*সহ যাত্রিক প্রযোজনা সংস্থার একাধিক চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
জীবনের শেষদিকে দীর্ঘদিন লিভারের জটিল রোগে ভুগছিলেন। ২০১৭ সালে মারাত্মক চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ২০১৭ সালের ১৯ জুলাই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন হারায় এক নিবেদিতপ্রাণ ও বহুমাত্রিক শিল্পীকে।
আবদুর রাতিন কখনো প্রচারের আলো খুঁজে বেড়াননি; বরং প্রতিটি চরিত্রকে নিজের অভিনয়গুণে জীবন্ত করে তুলেছেন। চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তাঁর আন্তরিকতা, শিল্পনিষ্ঠা এবং বহুমুখী প্রতিভা বাংলা অভিনয়জগতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আজ তাঁর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই গুণী শিল্পীকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, আবদুর রাতিন। আপনার শিল্পকর্ম ও স্মৃতি বাংলা সংস্কৃতির ভাণ্ডারে চিরঅম্লান হয়ে থাকবে।