মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আজ বাংলা ও হিন্দি সিনেমার এক অনন্য দীপ্তিময় অভিনেত্রী সুমিত্রা দেবী'র শুভ জন্মদিন

আজ বাংলা ও হিন্দি সিনেমার এক অনন্য দীপ্তিময় অভিনেত্রী সুমিত্রা দেবী'র শুভ জন্মদিন

আজ বাংলা ও হিন্দি সিনেমার এক অনন্য দীপ্তিময় অভিনেত্রী সুমিত্রা দেবী'র শুভ জন্মদিন

১৯৪০-৫০-এর দশকের বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের নাম—সুমিত্রা দেবী। সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়গুণে তিনি ছিলেন সময়ের সেরা। বিখ্যাত পরিচালক, সমালোচক এবং দর্শকসমাজ তাঁকে ‘সবচেয়ে সুন্দরী অভিনেত্রী’ হিসেবে অভিহিত করতেন। আজ তাঁর জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

সুমিত্রা দেবীর আসল নাম নীলিমা চট্টোপাধ্যায়। ১৯২৩ সালের ২২ জুলাই সিউড়িতে সুমিত্রা দেবীর জন্ম। তাঁর বাল্য শিক্ষা মজফফরপুরে। ১৯৩৪ সালে বিহারে ভূমিকম্প হয়। বাবা মূরলীধরের সঙ্গে সপরিবার চলে আসেন সুমিত্রা কলকাতায়। পড়াশোনার ছেদ পড়ে। আবার ভর্তি হন দেশবন্ধু গার্লস হাইস্কুলে। তবে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেননি। ছোট থেকেই তাঁর ইচ্ছা ছিল রুপোলি পর্দার ভাল অভিনেত্রী হওয়ার, নায়িকা হওয়ার। তার কিশোর বয়সে, তিনি প্রবীণ অভিনেত্রী কানন দেবীর সৌন্দর্য দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং একজন অভিনেত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। নাচের তালিম নিয়েছিলেন।


মেয়ে সিনেমায় অভিনয় করতে ইচ্ছুক জেনে বাবা চিন্তায় পড়লেন। তাই তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিলেন মেয়ের। কিন্তু বিবাহিত জীবন সুখের হল না। একদিন স্বামীগৃহ ভাগলপুর ছেড়ে চলে এলেন। 
অভিজাত রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে বলে চিত্রজগতের যোগদানের জন্য তাঁকে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এব্যাপারে ছোটভাই তাঁর পাশে থেকেছেন সব সময়। ভাইয়ের উৎসাহে উদ্বুদ্ধ হয়েই নীলিমা একদিন তাঁর ফটোসহ একটি আবেদন পত্র পাঠান নিউ থিয়েটার্সে। চিঠির উত্তর এল। ইন্টারভিউ দিলেন। তাতে উতরে যাওয়ায় অভিনয়ের শিক্ষাদান শুরু হল। ছবির পর্দায় আর নীলিমা নয়, তাঁর নাম হল সুমিত্রা দেবী।
পরিচালক অপূর্ব মিত্রের নজরে পড়লেন তিনি। অপূর্ব মিত্র তাঁর ‘সন্ধি’ ছবিটি তখন তৈরি করছিলেন। অপূর্ব মিত্র প্রযোজক দেবকীকুমার বসুর সামনে নিয়ে এলেন সুমিত্রাকে। প্রযোজকের পছন্দ হল। চিত্রজগতে তাঁর নতুন নাম হল সুমিত্রা। ১৯৪৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘সন্ধি’ ছবিটি। প্রথম ছবিই হিট।


চলচ্চিত্রটি ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে এবং ১৯৪৫ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জন্য BFJA পুরস্কার জিতেছিল।
নবাগত নায়িকা সুমিত্রা দেবীকে এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘পথের দাবি’, ‘জয়যাত্রা’, ‘অভিযোগ’, ‘স্বামী’, ‘দেবী চৌধুরাণী’, ‘একদিন রাত্রে’, ‘দস্যুমোহন’- একের পর এক ছবি করে গেছেন তিনি।


দাদা গুঞ্জল দ্বারা পরিচালিত হিন্দি চলচ্চিত্র 'মমতা' (১৯৫২) তে 'মা'-এর চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছেন। জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী বাংলা চলচ্চিত্র 'আঁধারে আলো' (১৯৫৭)-তে শোকাহত হৃদয়ের বালিকা 'বিজলি'র চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি সমালোচকদের কাছ সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া অর্জন করেন।

 

সতীশ দাশগুপ্তের পরিচালনায় ‘পথের দাবী’ ছবিতে তিনি করলেন ভারতীর চরিত্র। সব্যসাচীর চরিত্রে দেবী মুখোপাধ্যায়। সুদর্শন সু-অভিনেতা দেবী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুমিত্রার পরবর্তীকালে বিয়ে হয়। এটি ছিল সুমিত্রার দ্বিতীয় বিয়ে। দেবী মুখোপাধ্যায় ও সুমিত্রা দেবীর পরবর্তী ছবি ‘অভিযোগ’। পরিচালক সুশীল মজুমদার। স্বামী-স্ত্রীর পরবর্তী ছবি ‘জয়যাত্রা’। এই ছবির সময় থেকে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। সংসারী ঝামেলা এড়াতে আত্মহত্যা করেন দেবী মুখোপাধ্যায়। ‘জয়যাত্রা’ মুক্তির আগেই সাংসারিক মনোমালিন্যকে কেন্দ্র করে দেবী মুখোপাধ্যায় আত্মহত্যা করেছিলেন। সুমিত্রা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। ছবির জগৎ থেকে কিছুদিনের জন্য তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। পরে আবার ফিরে আসেন ছবির জগতে।

 


দ্বিতীয় পর্যায়ে সুমিত্রার অভিনয়-দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায় দুটি স্মরণীয় উপন্যাসের চিত্ররূপে। প্রথমটি বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরানী’। নামভূমিকায় তিনি। বিপরীতে ব্রজেশ্বরের চরিত্রে প্রদীপকুমার। দ্বিতীয়টি শরৎচন্দ্রের ‘স্বামী’। সেখানে তিনি নায়িকা সৌদামিনীর চরিত্রে। স্বামীর ভূমিকায় পাহাড়ী সান্যাল, প্রেমিক নরেনের ভূমিকায় প্রদীপকুমার। দুটি ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করলেন সুমিত্রা দেবী। এই ছবি দুটির হিন্দি ভার্সানেও নায়িকা হয়েছিলেন সুমিত্রা দেবী।

 

অশোককুমার মুম্বইয়ে নিয়ে গেলেন সুমিত্রা দেবীকে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রজনী’ উপন্যাসের হিন্দি চিত্ররূপ ‘সমর’ ছবিতে অশোককুমার অমরনাথের চরিত্রে অভিনয় করলেন। লবঙ্গলতার চরিত্রে সুমিত্রা দেবী। বোম্বে টকিজের ব্যানারে নির্মিত হয়েছিল ‘সমর’ ছবিটি। বাংলা-হিন্দি দু-জায়গাতেই অভিনয় করলেন সুমিত্রা। সুমিত্রা দেবীর হিন্দি ছবির তালিকায় রয়েছে ময়ূরপঙ্খী, ওসিয়াতনামা, মশাল, প্রতিবাদ, রাজযোগী, জাগতে রহো, মাই সিস্টার, উঁচনীচ, আনটাচেবল ইত্যাদি ছবি। 
বহুদিন বাদে আবার বাংলা ছবিতে শেষবারের মতো অভিনয় করলেন সুমিত্রা দেবী ১৯৬৪ সালে। সন্তোষকুমার ঘোষের ‘কিনু গোয়ালার গলি’ উপন্যাসের চিত্ররূপ দিলেন ও সি গঙ্গোপাধ্যায়। সেখানে এক ব্যর্থদম্পতির চরিত্রে কালী বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুমিত্রা দেবী অভিনয় করেছিলেন। বন্ধ্যানারীর চরিত্র সবাইকে চমকে দিলেন সুমিত্রা। আর অভিনয় করেননি সুমিত্রা। না হিন্দিতে না বাংলায়। সুমিত্রা মুম্বই-প্রবাসী এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। বিবাহসূত্রে মুম্বইয়ে ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তবে সাফল্য পাননি। সুমিত্রা-প্রযোজিত শেষ হিন্দি ছবি ‘এক চাদর ময়লি সি’।

 

সম্ভ্রম জাগানোর মতো ব্যক্তিত্ব ছিল সুমিত্রা দেবীর। সুমিত্রা দেবী খুব বিনয়ী ছিলেন বলে সকলের ভালোবাসা পেয়েছেন। চলচ্চিত্রের মানুষজন তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। পঞ্চাশের দশকের শেষাশেষি চিনে অনুষ্ঠিত হয় এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এ অংশগ্রহণকারী ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন তিনি।
পুরস্কার ও সম্মাননা:
দুইবার ‘সেরা অভিনেত্রী’ হিসেবে BFJA পুরস্কার বিজয়ী।
১৯৫২ সালে ‘মমতা’ ছবিতে মা’র চরিত্রে অমর হয়ে আছেন।

 

ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন চীনে আয়োজিত এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে।
কিছুদিন রোগভোগের পর সুমিত্রা দেবী পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান ১৯৯০ সালের ২৮ আগস্ট মুম্বইয়ে। মৃত্যুকালে তার.বয়স হয়েছিল ৬৭ বৎসর। শিল্পীরা অমর হয়ে থাকেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে। সেইভাবেই সুমিত্রা দেবী আজও সজীব হয়ে আছেন দর্শকদের অন্তরে। তাঁর মতো রূপবতী অভিনেত্রী চিত্রজগতে খুবই কম দেখা গেছে।
তিনি শুধু অভিনেত্রী ছিলেন না, ছিলেন এক সংগ্রামী নারী, যিনি সামাজিক রূঢ়তা ভেঙে নিজের পথ নিজেই তৈরি করেছিলেন। তাঁর সৌন্দর্য, অভিনয়, বিনয়, এবং আত্মমর্যাদা তাঁকে বাংলা ও হিন্দি দুই চলচ্চিত্রেই অমর করে রেখেছে।
আজ তাঁর জন্মদিনে, এই মহীয়সী শিল্পীকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। 
শিল্পীরা অমর হন তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে।
সুমিত্রা দেবী আজও বেঁচে আছেন আমাদের হৃদয়ে।