ভবিষ্যতে সরাসরি বা পূর্ণকালীন রাজনীতিতে যোগ দেবেন কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতের ব্যঙ্গাত্বক রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র এক শীর্ষ নেতা মুচকি হেসে বলেছেন, ‘ভারতে কোনো কিছুকেই ‘না’ বলতে নেই।’ নিট প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির জেরে শনিবার (২৫ জুলাই) শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মাধ্যমে সিজেপির মাসব্যাপী আন্দোলনের সফল সমাপ্তি ঘটেছে। তবে দলটি জানিয়েছে, এখনই তাদের পূর্ণকালীন রাজনীতিতে আসার কোনো পরিকল্পনা নেই; বরং তরুণদের নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করাই এখন তাদের মূল অগ্রাধিকার।
কেন্দ্রীয় সরকার আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলো মেনে নেওয়ার পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা এবং সৌরভ দাস আন্দোলনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং এটি পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলে রূপ নেবে কিনা, তা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ‘আমার মাথায় এখন একটাই চিন্তা—বাড়ি ফিরে শান্তিতে ঘুমানো, একটু বিশ্রাম নেওয়া আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। গত কয়েক মাস ধরে আমি বাড়ি থেকে দূরে। গত দুই মাসে যা যা ঘটেছে, তা নিয়ে এখন একটু ভাবা দরকার। ঘটনাগুলো আমাদের সবার জন্যই বেশ আবেগঘন। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের, আনন্দের এবং স্বস্তির একটি মুহূর্ত। এর পর কী হবে, তা সামনেই দেখা যাবে।’
সরাসরি রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, ভারতে কোনো বিষয়কেই ‘না’ বলতে নেই।’
তবে দলের আরেক মুখপাত্র সৌরভ দাস স্পষ্ট জানান, রাজনীতি তাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য একদম পরিষ্কার। এই আন্দোলনকে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। কারণ দেশে ইতোমধ্যে ৭৫০ থেকে ৮০০টি রাজনৈতিক দল রয়েছে, যার একটিও তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। আমরা আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাই, যাতে ক্ষমতায় যে রাজনৈতিক দল বা নেতাই থাকুক না কেন, তারা তরুণদের স্বার্থে কাজ করতে বাধ্য হয়।’
কয়েক সপ্তাহের টানা প্রতিবাদের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দিনই সিজেপি নেতাদের এই বক্তব্য সামনে এলো। পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান উল্লেখ করেন, গত ১০ দিনের ঘটনাবলী তাকে গভীরভাবে ‘ব্যথিত’ করেছে এবং এটি তার ‘ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় নয়’।
তিনি আরও দাবি করেন, কোনো ‘দেশবিরোধী শক্তি’ যেন এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে না পারে এবং দেশের ঐক্য যেন বজায় থাকে, সেই কারণেই তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন। একই সঙ্গে কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন আইনি জটিলতায় না পড়ে, সে বিষয়েও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা আমলে জনরোষের মুখে পদত্যাগ করা দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এর আগে ২০১৮ সালে হ্যাশট্যাগমিটু আন্দোলনের সময় যৌন হয়রানির অভিযোগে পদত্যাগ করেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর।
গত ২০ জুন দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি-র অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সরকারের অবস্থান বদলেরই একটি বড় সংকেত। আম আদমি পার্টির সাবেক কর্মী অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে গত মে মাসে একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন ক্যাম্পেইন হিসেবে সিজেপি-র যাত্রা শুরু হলেও, দেখতে দেখতে তা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহত্তম যুব আন্দোলনে রূপ নেয়।
বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জীতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে শেষ বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙ্কা জানান, পরিবেশ বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। প্রতিনিধি দলটি বৈঠককক্ষে প্রবেশ করার আগেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগপত্র জমা পড়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আজকের বৈঠকটি খুব ইতিবাচক ছিল। আমরা পৌঁছানোর আগেই পদত্যাগের ঘটনাটি ঘটে যায়। আলোচনা মূলত বাকি দুটি দাবিকে কেন্দ্র করেই হয়েছে। খুব দ্রুতই সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়। আন্দোলনের এই সুন্দর ও ইতিবাচক সমাপ্তির জন্য এবং আমাদের দাবিগুলো যেভাবে চেয়েছিলাম সেভাবেই মেনে নেওয়ায় আমরা সরকারের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই।’
প্রসঙ্গত, সরকার গত ২০ জুলাই প্রথম সিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসে। পরবর্তীতে ২৮ জুন প্রখ্যাত অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুক এই আন্দোলনে যোগ দিলে তা নতুন গতি পায়। বৃহস্পতিবার রাতে ওয়াংচুক তার অনশন ভঙ্গ করেন।
মন্ত্রী ভবনের পরিবর্তে একটি নিরপেক্ষ স্থানে আলোচনার দাবি জানিয়েছিল সিজেপি। সেই অনুযায়ী কনস্টিটিউশন ক্লাবে দ্বিতীয় দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং শনিবার (২৫ জুলাই) চূড়ান্ত আলোচনার মাধ্যমে বাকি দাবিগুলো মেনে নেওয়া হয়।
আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআর তুলে নেওয়ার বিষয়ে রাঙ্কা জানান, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারী এবং গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের মধ্যে পার্থক্য করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘সিজেপি প্রথম দিন থেকেই অহিংস প্রতিবাদের পক্ষে ছিল। লিখিত চুক্তিতে সমস্ত প্রতিবাদকারী ও আয়োজকদের বিরুদ্ধে থাকা এফআইআর প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে কোনো মামলা না করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।’
দীর্ঘ এক মাস ধরে আন্দোলন চলার কারণ সম্পর্কে রাঙ্কা বলেন, ‘এই প্রশ্নটি সরকারের কাছেই করা উচিত। আমরা নাড্ডাজীকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম—সরকারের সাড়া দিতে কেন ৩০ দিন সময় লাগল? আমাদের সঙ্গে আরও আগেই যোগাযোগ করা যেত। আমরা সবাই শিক্ষিত ও পেশাদার মানুষ, পেশাদার আন্দোলনকারী নই। দীপকে বোস্টনে পড়াশোনা করছিল, আন্দোলনের পর তার চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল।’
পদত্যাগপত্রে আন্দোলনকারীদের নিয়ে প্রধানের মন্তব্যের জবাবে রাঙ্কা আশা প্রকাশ করেন, সরকার ভবিষ্যতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘দেশবিরোধী’ বা ‘ভাইরাস’ বলা বন্ধ করবে। তিনি বলেন, ‘আমি গভীরে যেতে চাই না, তবে দিনশেষে বিচার অর্জিত হয়েছে—এটাই বড় কথা।’
