আমজাদ খান: খলনায়ক হয়েও নায়ক
হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে সেরা খলনায়কদের তালিকায় চোখ বুজে শীর্ষে ঠাঁই করে নেবে যে চরিত্রটি সেটি হলো 'শোলে' সিনেমার দুর্ধ্বর্ষ ডাকাত গাব্বার সিং। আর এই গাব্বারকে পর্দায় অমর করে রেখেছেন এক অনন্য অভিনেতা – আমজাদ খান।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী।
এই দুর্দান্ত অভিনেতাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
আমজাদ খান, বলিউডের ইতিহাসে এমন এক অভিনেতা যিনি খলচরিত্রে অভিনয় করেও জনপ্রিয়তায় ছাড়িয়ে গেছেন অনেক নায়ককে। ‘শোলে’ ছবির গাব্বার সিং চরিত্রটি তাকে দিয়েছে কিংবদন্তির মর্যাদা। ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'শোলে' ছবিতে তাঁর সংলাপ ও উপস্থিতি আজও সমানভাবে দর্শকদের মনে গেঁথে আছে।
পুরো নাম আমজাদ জাকারিয়া খান। জন্ম অবিভক্ত ভারতের পেশোয়ারে। তার বাবা জাকারিয়া খান ছিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা, যিনি ‘জয়ন্ত’ নামে অভিনয় করতেন।
ছোটবেলাতেই সিনেমা জগতে পা রাখেন আমজাদ। ১৯৫১ সালে ‘নাজনিন’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু। বাবার সঙ্গে ছোট ছোট ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বহু ছবিতে।
সেন্ট অ্যান্দ্রুজ হাই স্কুলে পড়াশোনা শেষে কলেজে পড়াকালীন তিনি ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচিত হন।
অভিনয়ে বৈচিত্র্য
‘শোলে’–তে গাব্বার হয়ে বাজিমাত করার পর তিনি শুধু ভিলেনই ছিলেন না – ছিলেন বহুপ্রজ অভিনেতা।
* সত্যজিৎ রায়ের ‘সতরঞ্জ কি খিলাড়ি’তে নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ হয়ে চমকে দেন সকলকে।
* ‘মুকাদ্দার কা সিকান্দার’, ‘নসিব’, ‘দাদা’, ‘ইনকার’, ‘নাস্তিক’, ‘দেশ পরদেশ’ – খলনায়ক হিসেবে দারুণ সফল।
* ‘লাওয়ারিস’, ‘ইয়ারানা’, ‘কুরবানি’, ‘লাভ স্টোরি’, ‘চামেলি কি শাদি’-তে ইতিবাচক ও কমেডি চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করেছেন।
* তাঁর অভিনয় দক্ষতা এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, তিনি একই ছবিতে কখনো নির্মম খলনায়ক আবার কখনো সহানুভূতিশীল বাবা – সব চরিত্রেই ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য।
বলিউডে নায়ক-নায়িকাই সাধারণত বিজ্ঞাপনের মুখ হন—এটাই রীতি। কিন্তু সেই রীতি ভেঙে দিয়েছিলেন আমজাদ খান তাঁর গব্বর সিং চরিত্র দিয়ে। 'গব্বর কি আসলি পসন্দ'–এই সংলাপ দিয়ে ব্রিটানিয়া বিস্কিটের বিজ্ঞাপনে প্রথমবার কোনো খলচরিত্র হয়ে উঠেছিল পণ্যের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর।
১৯৭৬ সালে ‘দ্য গ্রেট গ্যাম্বলার’-এর শুটিংয়ে যাওয়ার সময় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েন আমজাদ। গাড়ির স্টিয়ারিং তাঁর ফুসফুস ভেদ করে ঢুকে যায়, ভেঙে যায় পাঁজরের ১৩টি হাড়। কোমায় চলে যান তিনি। স্ত্রীও গুরুতর আহত হন, কিন্তু অলৌকিকভাবে তাঁদের অনাগত সন্তান নিরাপদে জন্ম নেয়।
দীর্ঘ চিকিৎসার পরে তিনি ফিরলেও, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার ওজন বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়। অবশেষে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯২ সালের এই দিনে মাত্র ৫১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি।
প্রায় ১৩০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। মৃত্যুর পরও বেশ কিছু ছবি মুক্তি পেয়েছিল।
তাঁর পুত্র শাদাব খান-ও বলিউডে কাজ করেছেন।
পর্দায় ছিলেন ভয়ঙ্কর, কিন্তু বাস্তবে ছিলেন এক হৃদয়বান মানুষ। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে জীবনযাপন করতেন শান্তিপূর্ণভাবে। সিনেমার দুনিয়ায় প্রেম ও গসিপের ছড়াছড়ির মাঝেও তার ব্যক্তিজীবন ছিল অনবদ্য ও কলঙ্কহীন।
খলনায়ক হয়েও তিনি ছিলেন আমাদের মনের মঞ্চের নায়ক।
আমজাদ খান – আপনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি আপনাকে।