এই মহান শিল্পীর ৯৭ তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাই।
নজরুল স্বয়ং গান শিখিয়েছিলেন মানবেন্দ্রকে, রইল শিল্পীর কিছু অজানা গল্প।
উপমহাদেশের বিখ্যাত নজরুল সঙ্গীতশিল্পী বরিশাল উজিরপুর মুখার্জী পরিবারের উত্তরসূরী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। যিনি একাধারে কন্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক।
১৯২৯ সালের ১১আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ডাক নাম ছিল পল্টন। পিতা অতুল চন্দ্র মুখার্জী। তাঁরা ছিলেন তিন ভাই এক বোন। মানবেন্দ্র সবার বড়। ছোটবেলা থেকেই এক সুরেলা পরিবেশে বেড়ে ওঠেন মানবেন্দ্র। নিজের দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে বহু হিট আধুনিক গান শ্রোতাদের উপহার দিলেও নজরুলগীতির প্রতি এক আলাদাই ভালবাসা ছিল তাঁর। শোনা যায় মানবেন্দ্রর কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায় ছিলেন কাজি নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এমনকী স্বয়ং কাজি নজরুল ইসলাম নাকি মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যাকে দুটি গান শিখিয়েছিলেন। গানদু'টি ছিল 'সখী সাজায় রাখ লো পুষ্পবাসর' এবং 'হে মাধব হে মাধব'। নিজের জীবনে প্রচুর নজরুলগীতি রেকর্ডও করেছেন মানবেন্দ্র।
'ময়ূরকণ্ঠী রাতের নীলে’, ‘তুমি ফিরায়ে দিয়েছ বলে’, ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’ প্রভৃতি কালজয়ী গানের কণ্ঠশিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। ১৯৭০ সালে হিজ মাস্টার্স ভয়েজ কোম্পানির তত্ত্বাবধানে কয়েকশ নজরুল সঙ্গীত গেয়ে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় পশ্চিম বঙ্গসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নজরুল সঙ্গীতের অনুরাগী শিল্পীদের হৃদয়ে স্থান করে নেয়।
গায়ক মানবেন্দ্রর পাশাপাশি সুরকার মানবেন্দ্রর খ্যাতিও কিছু কম ছিল না। 'সাড়ে চুয়াত্তর' ছবিতে রাগ আহির ভৈরবের ওপরে একটি আলাপ গেয়ে চিত্রপরিচালক নির্মল দে-এর মন জয় করে নিয়েছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। তিনিই প্রথম মানবেন্দ্রকে সুরকার হওয়ার প্রস্তাব দেন। সেই মতো একদিন নির্মলবাবুর সঙ্গেই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে গেলেন মানবেন্দ্র। প্রথম অবশ্য মানবেন্দ্রর ওপর আস্থা রাখতে পারেননি তারাশঙ্কর। একপ্রকার বাতিলই করে দিচ্ছিলেন তাঁকে। কিন্তু তারপর হঠাৎ দু'কলম লিখে তৎক্ষনাৎ মানবেন্দ্রকে সুর করতে বলেন। মানবেন্দ্র শুধু জানতে চেয়েছিলেন গানের সিচুয়েশান। তারপর এমন সুর করলেন, যে একেবারে আপ্লুত হয়ে গেলেন তারাশঙ্কর। চলে এল 'চাপাডাঙার বউ' ছবিতে সুরকার হিসেব কাজ করার সুযোগ। এতো গেল গানের কথা। জীবনে একবার অভিনয়ও করেছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। 'সাড়ে চুয়াত্তর' ছবিতে করেছিলেন অভিনয় যদিও ওই একবারই। আর অভিনয়ের দিকে যাননি তিনি। তবে মিউজিক্যাল বায়োস্কোপ করবেন ভেবেছিলেন। সেই জন্য তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে 'জলসাঘর' কাহিনীটিও কিনেছিলেন। কিন্তু সে ছবি করা আর হয়নি। পরে সত্যজিৎ রায় সেই ছবি বানান ।
মানবেন্দ্র নিজেও বেশ কয়েকটি বাংলা ছবিতে সুর রচনা করেছিলেন যার মধ্যে 'মায়ামৃগ', 'বধু', যত মত তত পথ', 'জয় জয়ন্তী', 'গোধুলি বেলা' উল্লেখযোগ্য ছবি।
১৯৫৫ সালের ৮ই মে মানবেন্দ্রের সঙ্গে বেলা দেবীর বিয়ে হয়। তাঁর শেষ জীবন কেটেছে কলকাতার যাদবপুর এলাকায়। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রবাদ প্রতিম গায়ক তথা শিল্পী মানবেন্দ্র ম্যাসিভ হার্ট এট্যাকে মৃত্যু বরণ করেন।