সোমবার, আগস্ট ৩১, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আজ ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত জগতের এক অবিস্মরণীয় নাম সানাই বাদক বিসমিল্লা খানের মৃত্যুবার্ষিকী

আজ ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত জগতের এক অবিস্মরণীয় নাম সানাই বাদক বিসমিল্লা খানের মৃত্যুবার্ষিকী

আজ ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত জগতের এক অবিস্মরণীয় নাম সানাই বাদক বিসমিল্লা খানের মৃত্যুবার্ষিকী

একটি অত্যন্ত সাধারণ বাদ্যযন্ত্র সানাইয়ের বাজনাকে উচ্চাঙ্গ যন্ত্রসঙ্গীতের মর্যাদা তিনিই দিয়েছিলেন। সঙ্গীতজগতে তিনি 'ওস্তাদ' উপাধিতে ভূষিত হন। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে তৃতীয় ভারতরত্ন প্রাপক বিসমিল্লা খান। ভারতের একাধারে চারটি বে-সামরিক সম্মান পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ এবং ভারতরত্নের সম্মানে গর্বোজ্জ্বল হয়ে আছেন তিনি।

 


১৯১৬ সালের ২১ মার্চ বিহারের বক্সার জেলার ডুমরাও গ্রামে বিসমিল্লা খানের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম পয়গম্বর বজ্র খান ও মায়ের নাম ছিল মিঠুনবাই। এই দম্পতির প্রথম পুত্র ছিলেন সামসুদ্দিন খান। দ্বিতীয় পুত্র জন্মালে প্রথমে জ্যেষ্ঠ পুত্রের সঙ্গে নাম মিলিয়ে রাখা হয় কামরুদ্দিন। কিন্তু পিতামহ রসুল বক্স খান শিশুটির জন্মের সংবাদ পেয়ে ঈশ্বরের পবিত্র নাম বিসমিল্লাহ' উচ্চারণ করেন এবং তারপর থেকেই শিশুটির নাম বদলে রাখা হয় বিসমিল্লা। এই নামেই ভবিষ্যতে তিনি সারা দুনিয়ায় পরিচিতি পেয়েছিলেন। তাঁর বাবা ডুমরাওয়ের মহারাজা কেশব প্রসাদ সিংয়ের দরবারে সানাই বাজাতেন।

 

ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের পরিবেশে বড়ো হওয়ার জন্য সঙ্গীতের প্রতি বিসমিল্লার আকর্ষণ জন্মায়। তিনি তাঁর বাবাকে সানাই বাজাতে দেখে বড়ো হয়েছিলেন এবং নিজেও সানাইবাদক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ছয় বছর বয়সে তিনি বেনারসে যান এবং সেখানেই শুরু হয় তাঁর সঙ্গীত শিক্ষা। তাঁর মামা আলি বক্স বেনারসের বিশ্বনাথ মন্দিরে সানাই বাজাতেন। ছোট্ট বিসমিল্লার যন্ত্রসঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ দেখে আলি তাঁকে সানাই বাজানো শেখানোর সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৩৭ সালে কলকাতায় আয়োজিত ইণ্ডিয়ান মিউজিক কনফারেন্স'-এ তিনি প্রথমবার জনসমক্ষে অনুষ্ঠান করেন। এই অনুষ্ঠানের ফলে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে সানাই প্রচারের আলোয় আসে ও সঙ্গীত-সমালোচকেরা বিসমিল্লার কৌশলের ব্যাপক প্রশংসা করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি লক্ষ্ণৌ-এর অল ইণ্ডিয়া রেডিও'তে কাজ করার সুযোগ পান। আফগানিস্তান কানাডা বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ইরাক পশ্চিম আফ্রিকা জাপান হংকং এবং ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করেছিলেন বিসমিল্লা। এডিনবার্গ মিউজিক ফেস্টিভ্যাল, কান আর্ট ফেস্টিভ্যাল, ওসাকা ট্রেড ফেয়ার ইত্যাদির মতো আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে সানাই বাদন বিসমিল্লাকে সারা দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।

 

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাঁকে আর সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে দিল্লির লালকেল্লার মূল অনুষ্ঠানে সানাই বাজিয়েছিলেন বিসমিল্লা খান। এরপর থেকে প্রতি বছরই এই দিনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর বিসমিল্লার সানাইয়ের সুর স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই অনুষ্ঠানটি মিল্লি থেকে দূরদর্শন দ্বারা সরাসরি সম্প্রচারিত হতো, সেই কারণে বিসমিল্লা পৌঁছে যেতেন প্রতিটি ভারতবাসীর ঘরে।
১৯৫৮ সালে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত বাংলা ছবি 'জলসাঘর'-এর নেপথ্যে যন্ত্রসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে ছিলেন বিসমিল্লা খান। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প জলসাঘরকে ভিত্তি করে তৈরি এবং বিখ্যাত অভিনেতা ছবি বিশ্বাস ও তুলসী লাহিড়ী অভিনীত ছবিটি বিপুল জনপ্রিয় হয়। প্রতিটি গান ও তার নেপথ্যে বিসমিল্লার বাজানো সানাই বাঙালি দর্শকের মন কেড়ে নেয়।

 

বিসমিল্লা খানের সুর ব্যবহার করতে পিছিয়ে থাকেনি দক্ষিণ ভারতও। বিজয় পরিচালিত কন্নড় ভাষার ছবি সানাদি আপ্পান্না'য় সানাই বাজিয়েছিলেন তিনি। ১৯৮০ সালে তেলুগু ভাষায় এই ছবিটি পুনর্নির্মিত হয় ও টানা ৫০ সপ্তাহ ধরে একনাগাড়ে দর্শকরা এটিকে দেখতে ভিড় জমায়।
১৯৮৯ সালে বিসমিল্লা খানের জীবন অবলম্বনে বাঙালি পরিচালক গৌতম ঘোষ তৈরি করেন একটি তথ্যচিত্র সঙ্গ-এ-মিল সে মুলাকাত উস্তাদ বিসমিল্লা খান। বিসমিল্লা নিজে এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন।

 

তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছে বহু জীবনীগ্রন্থ সর্বোপরি ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা দপ্তরের অধীনে নবম শ্রেণির ইংরাজি পাঠ্যবইতেও তাঁর জীবন নিয়ে একটি অধ্যায় রাখা হয়েছে 'দা সাউণ্ড অফ মিউজিক নামে।
সারা জীবনে বিসমিল্লা খান তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এম.এস সুবালক্ষ্মী ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর-এর পরে তিনিই তৃতীয় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী যিনি ভারত সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ বে-সামরিক সম্মান ভারতরত্ন' পেয়েছিলেন। আরো তিনটি ভারতীয় বে-সামরিক সম্মান 'পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণ' ও 'পদ্মশ্রী পুরস্কারেও সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি। মধ্যপ্রদেশের রাজ্য সরকার তাঁকে প্রদান করেছিল তানসেন পুরস্কার আর কেরালা সরকারের পক্ষ থেকে স্বাধী সঙ্গীতা পুরস্কারম সম্মান পেয়েছিলেন বিসমিল্লা খান। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় বিসমিল্লাকে সম্মানসূচক 'ডক্টরেট' প্রদান করেছে।

 


২০০৬ সালের ২১ আগস্ট নব্বই বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিসমিল্লা খানের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে ভারত সরকার একদিনের জন্য জাতীয় শোকদিবস' পালন করে। ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রদত্ত 'গান স্যালুট'এর মাধ্যমে পুরনো বেনারসের ফাতেমান কবরস্থানে তাঁর দেহ সমাধিস্থ করা হয় যার সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল একটি সানাই।