স্বাধীন বাংলাদেশে নাটকের ক্ষেত্রে বিশেষ করে মঞ্চনাটকে একটি বিপ্লবের সূচনা হয় এবং এই বিরাট সাফল্যের পিছনে আবদুল্লাহ আল মামুনের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। কী রচনা, কী প্রযোজনা, নির্দেশনা ও পরিচালনা, কী অভিনয়, কী নাট্যশিল্পী সৃষ্টি করা— সকল ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।
আবদুল্লাহ আল মামুন ১৯৪২ সালের ১৩ জুলাই জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
আবদুল্লাহ আল মামুনের মা ফাতেমা খাতুন এবং বাবা অধ্যক্ষ আবদুল কুদ্দুস। ছাত্র হিসাবে মেধাবী ছিলেন তবে ছেলেবেলা থেকেই মনেপ্রাণে কিছুটা প্রতিবাদী ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে ইতিহাসে বিএ অনার্স আর ১৯৬৪ সালে একই বিষয়ে এমএ পাস করেন কৃতিত্বের সাথে।
ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন নিজেকে সম্পৃক্ত করেন অগ্নিঝরা প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক বাঙালীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের দুর্বার গণআন্দোলনে। চৌদ্দ বছর বয়সে আবদুল্লাহ আল মামুন তাঁর প্রথম নাটক ‘নিয়তির পরিহাস’ লেখেন।
শহীদ প্রফেসর মুনীর চৌধুরীর সংস্পর্শে এসে তিনি ষাটের দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে নাটকের অনুষ্ঠানমালা শুরু করেন। ‘মা’ নাটকের নির্দেশনা দিয়ে এবং এর একটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।
১৯৭২ সালে দেশের অন্যতম নাটকের দল ‘থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠিত হয় প্রফেসর কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে আর আবদুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার প্রমুখের অক্লান্ত এবং উদ্ভাবনী পরিশ্রমের ফসল হিসাবে।
আবদুল্লাহ আল মামুনের বহু নাটকের মধ্যে যে কটি জনিপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে যায় সেগুলো হলো— 'সুবচন নির্বাসনে', 'এখন দুঃসময়', 'সেনাপতি', অরক্ষিত মতিঝিল', 'এখনও ক্রীতদাস', 'মেরাজ ফকিরের মা' ও 'কোকিলারা'।
সব ক’টি নাটকেরই মূল প্রতিপাদ্য বলতে গেলে একটিই— দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত নারীসহ অন্যান্য নিচতলার মানুষের অনাচারের বিরুদ্ধে আবদুল্লাহ আল মামুনের প্রতিবাদী উচ্চকণ্ঠ।
চলচ্চিত্র নির্মাণেও আবদুল্লাহ আল মামুন অনবদ্য সৃজনশীলতার পরিচয় রেখে গেছেন। শহীদুল্লাহ কায়সারের অমর সৃষ্টি ‘সারেং বউ’— সমাজের সংকীর্ণতা অপশাসন, শোষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনা ও রূপায়নে চলচ্চিত্র ‘সারেং বউ’ সম্ভবত আরও বৃহত্তর দাগ কাটে বিদগ্ধ মহলের চিন্তাচেতনা ও সাহসে।
টেলিভিশন ধারাবাহিক ও একক নাটকেও আবদুল্লাহ আল মামুন তাঁর সৃজনশীল মনন ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন— 'সংশপ্তক', 'বিষুবরেখা', 'বরফ গলা নদী', 'তরঙ্গভঙ্গ' ও 'নন্দিত নরক'-এ।
২০০৮ সালে আজকের এই দিনে (২১ আগস্ট) ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ৬৫ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলী।