মোঃশাহিন ফকির,
পিরোজপুর প্রতিনিধি:
পিরোজপুরে প্রায় পাঁচ শতাধিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়েই চলছে প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম। দীর্ঘদিন ধরে পদগুলো শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান। অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা। এতে একদিকে যেমন বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার মান নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
পিরোজপুর পৌরসভার মধ্য পিরোজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস নিচ্ছেন একজন শিক্ষক। এটি তার টানা ৪র্থ ক্লাস। আবার স্কুলটিতে প্রধান শিক্ষক না থাকায় তাকেই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এছাড়াও সহকারী একজন শিক্ষক চিকিৎসাকালীন ছুটিতে থাকায় তারও ক্লাস নিচ্ছেন তিনি। একদিকে ক্লাসের চাঁপ, অন্যদিকে প্রশাসনিক কাজ সব মিলিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।
একজন শিক্ষক বলেন," শিক্ষক সংকটের কারণে আমাদের তো সমস্যা হচ্ছেই, প্লাস বাচ্চাদেরও সমস্যা হচ্ছে। যেমন আমি প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীর শিক্ষক, আমার এই ক্লাসটা শুরু হয় সাড়ে ৯ টায় আর ১২ টা পর্যন্ত চলে। কিন্তু দেখা যায় যে আমাকে এর মধ্যে থ্রির ফার্স্ট পিরিয়ডটা নিতে হয়। যেহেতু থ্রির বাংলা ক্লাস, ওখানেও আমার সময় দিতে হচ্ছে, প্লাস এখানে আবার কিছুক্ষণ পরে এসে আবার শিশু বাচ্চাদেরও ক্লাস নিতে হচ্ছে। তো এই দুইবার দুই জায়গায় ক্লাস নেওয়ার কারণে বাচ্চাদেরকে যথাযথভাবে আমি যতটুকু দেওয়া দরকার দিতে পারছি না।"
আরও এক শিক্ষক বলেন,"বিদ্যালয়ের পোস্ট হচ্ছে ৭টি, কিন্তু বর্তমানে আমাদের বিদ্যালয়ে ৫টি পোস্ট আছে। মানে হেড টিচার বর্তমানে নেই। উনি হচ্ছে রিটায়ার্ডে চলে গেছেন। আমাদের হেড টিচারের পোস্ট এবং একজন সহকারী শিক্ষকের পোস্ট ফাঁকা আছে। সহকারী শিক্ষক বর্তমানে বৈদেশিক ছুটিতে বিদেশে অবস্থান করছেন, যার ফলে... আর আমাদের বিদ্যালয়ের শিফট হচ্ছে একটা। যার কারণে আমাদের বিদ্যালয়ে একই সাথে একই টিচারের একই সাথে একই টাইমে দুটো ক্লাস নিতে হচ্ছে। যার কারণে আমাদের শিক্ষার্থীদেরও লেখাপড়ায় ঝামেলা হচ্ছে এবং আমাদের শিক্ষকদেরও ক্লাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।"
অপর একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন,"আমাদের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন থেকে প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য অবস্থায় আছে। আমাদের সহকারী আছি আমরা ৬ জন, এখান থেকে একজন প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্বরত আছেন। তো যেহেতু উনি সহকারী শিক্ষক ছিলেন, সহকারীর আমরা স্কুলে যে কাজগুলো করি তো উনি সেই কাজগুলোও করেন, পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের কাজগুলো তাকে করতে হয়। প্রশাসনিক দিকগুলোও তাকে দেখতে হয়। স্কুলে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক কাজ আছে, বাইরে তাকে বেশি সময় থাকতে হয়। দেখা যায় তখন আমাদের তার যে ক্লাসগুলো থাকে নির্ধারিত, সে ক্লাসগুলোতে আমাদের নিজের ক্লাসের পরেও তার ক্লাসগুলো আমাদেরকে নিতে হয়। আর আমরা দাবি করতেছি আমাদের বিদ্যালয়ে একজন প্রধান শিক্ষক যাতে আমরা খুব অল্প সময়ের ভিতরে পেতে পারি—এটা আমরা সবার কাছে দাবি জানাই।"
একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন,"আমি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ করে আসছি। আমার বিদ্যালয়ে প্রতিদিন আমার ৬টা ক্লাস। এই ৬টা ক্লাস আমার সামলিয়ে অফিশিয়াল বা প্রশাসনিক কাজ করতে খুবই কষ্ট হয়। যে কারণে আমার শিশুদের আমি যেভাবে ওদের গুণগত মান উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করি, তাতে কতটুকু পারছি আমি ঠিক বলতে পারছি না। কিন্তু যদি আমাদের শূন্য পদগুলো পূর্ণ হয়, তাহলে আমরা আশা করছি আরো বেশি প্রয়োগ করতে পারব।"
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, "পিরোজপুর জেলায় মোট ৯৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। প্রধান শিক্ষকের পদসংখ্যা ৯৮৯টি, এর ভিতরে পদ শূন্য আছে ৫৬৫টি।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, ২৫৮টি পদে সহকারী শিক্ষক থেকে চলতি দায়িত্বে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব প্রদান করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ আছে ৫৬২টি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোল্লা বখতিয়ার রহমান বলেন,আপনারা জানেন যে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের ২৪৫ জন শিক্ষক সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাদের পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং এনএসআই রিপোর্ট কার্যক্রম চলছে। এনএসআই রিপোর্ট এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট পাওয়া সাপেক্ষে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আর এই শূন্য পদ থাকার ফলে আমাদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, তবে তারপরেও আমরা কর্মরত যে শিক্ষক আছেন তাদের মাধ্যমে পাঠদান অব্যাহত রেখেছি।
দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষাবিদদের মতে, দ্রুত এ সংকটের সমাধান না হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুর্বল শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে পুরো শিক্ষাব্যবস্থায়।