কৃষক আবুল হাসানের বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নে। তাঁর শৈশব কেটেছে মাঠে বাবার কৃষিকাজ দেখে। অর্থের অভাবে পড়ালেখা করতে পারেননি। বাবার হাত ধরে শৈশবেই কৃষিকাজে যুক্ত হন। সেই থেকে কৃষিই তার জীবিকা ও সাফল্যের পথে বেড়ে ওঠা। বর্তমানে প্রায় ৬০০ একর জমিতে চাষাবাদ করেন আবুল হাসান।
এর মধ্যে নিজের জমি ৫০ একর। বাকি জমি নগদ লগ্নির মাধ্যমে চাষ করেন। ধান, তরমুজ, সয়াবিনসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করেন। কৃষিকাজ করে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের পড়ালেখার খরচও বহন করছেন।
তবে কৃষিকাজে সফল হলেও আবুল হাসান তাঁর চার ছেলের কাউকে কৃষিকাজে যুক্ত করেননি। বড় ছেলে পারভেজ পুলিশে চাকরি করেন। দ্বিতীয় ছেলে শরিফুল ইসলাম পড়ালেখা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তৃতীয় ছেলে মো. আরিফ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ছেন। আর ছোট ছেলে মো. হাসিব বর্তমানে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
আবুল হাসানের স্বপ্ন, তার সন্তানরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ভালো অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হোক।
কালের কণ্ঠকে আবুল হাসান বলেন, ‘ছোটবেলায় দেখেছি, বাবা অনেক কষ্ট করে কৃষিকাজ করতেন। তাঁরও স্বপ্ন ছিল আমরা দুই ভাই পড়ালেখা করে ভালো চাকরি করি। কিন্তু নানা সংকটে তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। বড় ভাই প্রবাসে চলে গেছেন, আর আমি বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে যাই। সেই থেকে কৃষিকাজই আমার পেশা।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় ৬০০ একর জমিতে ধান, তরমুজ, সয়াবিনসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছি। কৃষিকাজ করেই সংসারের খরচের পাশাপাশি ছেলেদের পড়ালেখার ব্যয় চালিয়ে যাচ্ছি। পড়ালেখা করতে না পেরে আমি কষ্ট করে কৃষিকাজ করেছি। আমার একটাই স্বপ্ন—আমার সন্তানরা যেন পড়ালেখা করে ভালো অবস্থানে যেতে পারে।’
কৃষক আবুল হাসানের মতো দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদের বর্তমান চিত্র একই। কৃষক পরিবারের নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ কৃষিকাজকে আর পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নয়। কেউ পড়ালেখা শেষে চাকরি কিংবা ব্যবসায় যেতে চাইছে, কেউ শহরমুখী হচ্ছে, আবার কেউ পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে।
ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ের এই পরিবর্তন এখন আর পরিবারের সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলতি বছর কৃষকের এই অনিশ্চয়তা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার সময় অতিবৃষ্টি ও উজানের পানিতে বিপুল জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষিশ্রমিক সংকট, শ্রমিকের বাড়তি মজুরি মজুরি এবং কৃষিযন্ত্রের স্বল্পতা। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, পাশাপাশি সময়মতো ফসল ঘরে তোলা যায়নি।
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলেও কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচনির্ভর কৃষি ক্রমে ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এতে ওই অঞ্চলের তরুণদের বড় একটি অংশ বিকল্প কর্মসংস্থানের আশায় শহরমুখী হচ্ছে।
