মোঃ রাকিবুল হাসান, গলাচিপা
পটুয়াখালীর গলাচিপার চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয় পাঁচ খাল পার হয়ে।
বাড়ি থেকে বের হলে সামনে খাল। একটি নয়, দুটি নয়—পাঁচ-পাঁচটি খাল।
সেই খাল পার হয়ে বিদ্যালয়ে যায় শিশুরা। বই-খাতা হাতে উঁচু করে ধরে কাটতে হয় দীর্ঘ সাঁতার। তারপর ভেজা কাপড়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিতে হয় শিশু শিক্ষার্থীদের।
অদম্য এমন শিশুর সংখ্যাও কম নয়, অন্তত ২০ জন।
তাদের বাড়ি পটুয়াখালী গলাচিপা উপজেলার দুর্গম এলাকা চরকারফারমায়। বিকল্প না থাকায় প্রতিদিন সাঁতার কেটে এসব শিশুকে তাদের যেতে হয় পাশের চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে মোট শিক্ষার্থী ৫১ জন। এর মধ্যে ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে পাঁচটি খাল সাঁতার কেটে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়।
বছরের বারো মাসই এভাবে কষ্ট করতে হয় শিশু শিক্ষার্থীদের। এতে বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়ছে তারা।
সরেজমিন গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) চরকারফারমা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা হয় সেখানকার কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে, হাসিবুল তাদের একজন।
বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া হাসিবুল জানায়, তাদের বাড়ি চরকারফারমার শেষ সীমানা দক্ষিণ দিকে ফরেস্টের পাশে। তার বন্ধু বাড়ির পাশের জহিরুলও একই বিদ্যালয়ে পড়ে।
তারা দুজন একসঙ্গে স্কুলে আসা-যাওয়া করে। এ জন্য পাঁচটি খাল সাঁতরাতে হয়। সে জানায়, প্রতিদিনই তার সঙ্গে ছয়-সাতজন খাল সাঁতার কেটে স্কুলে আসে। আর বৃষ্টির দিনে বই-খাতা ভিজে যায় বলেও জানায় হাসিবুল।
একই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আসাদুল জানায়, বৃষ্টি ও খালের পানিতে শরীর সারা দিনই ভিজে থাকে। এতে শরীর খারাপ করে। আসাদুলের ভাষ্য, ‘বেশি খারাপ লাগলে কয়েক দিন বাড়িতেই থাকি। আমাগো একটা নৌকা আছে। কিন্তু ওই নৌকা দিয়া নদীতে মাছ ধরতে যায়, তাই খাল সাঁতরেই স্কুলে যেতে হয়।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গলাচিপা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি অংশ চরকারফারমা। পাঁচ নদীর মোহনা আগুনমুখায় বিভক্ত সদর ইউনিয়নের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে গড়ে উঠেছে এ চর। এর দক্ষিণে ম্যানগ্রোভ বন, তার পরই বঙ্গোপসাগর। পশ্চিমে রামনাবাদ, পূর্বে তেঁতুলিয়া নদী আর উত্তরে উত্তাল পাঁচ নদীর মোহনা।
দূর থেকে চরটি আকর্ষণীয় স্থান হলেও চরে যাতায়াতের জন্য কোনো রাস্তাঘাট। এতে ভোগান্তি পোহাতে হয় সেখানে শিক্ষার্থীসহ বাসিন্দাদের। আর এই ভোগান্তি চরমে পৌঁছায় বর্ষা মৌসুমে। চরটিতে কোনো বেড়িবাঁধ না থাকায় বছরের সব সময়ই স্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে বিদ্যালয়ের মাঠ-রাস্তাঘাট সব ডুবে থাকে।
চরে ৮০টি জেলে ও কৃষক পরিবারের বাস। এসব পরিবারের শিশুদের জন্য ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের ৫১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ২৬ জন এবং ২৫ জন ছাত্রী। আর শিক্ষক রয়েছেন তিনজন।
চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম বলেন, ‘এই চরে ৮০টি পরিবার বাস করে। কিন্তু রাস্তা করার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। স্কুলে যাতায়াতের জন্য হলেও কিছু রাস্তাঘাট করা দরকার।’
গলাচিপা সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বলেন, ‘স্কুলে যাওয়ার রাস্তা নেই—এ কথাটা সত্য। তবে আপাতত কোনো বরাদ্দ নেই। সামনে বরাদ্দ পেলে অবশ্যই রাস্তার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।’
চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. নেছার উদ্দিন বলেন, ‘রাস্তাঘাট না থাকায় অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাস্তাঘাট হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে।’
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর বলেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক। রাস্তা না থাকার কারণে স্কুলের শিক্ষার্থী কমে গেছে। বিষয়টি ইউএনও ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কে জানানো হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। জায়গাটি পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
