কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ কেন্দ্র। প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেই কেন্দ্র এখন বছরের পর বছর তালাবদ্ধ।
কেন্দ্রটি চালু না হওয়ায় একদিকে যেমন স্থানীয় কৃষকরা প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘কুড়িগ্রাম ও জামালপুর জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাসকরণ’ প্রকল্পের আওতায় বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) ২০১৮ সালের ১ জুলাই এ প্রকল্পের কাজ শুরু করে।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে তাঁদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার পরিকল্পনাও ছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজারহাটের এ কেন্দ্রে ধান, গম ও সরিষা প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মসলা, চিপস ও বেকারি পণ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা রাখা হয়। এছাড়া মাছ, মাংস ও দুধসহ বিভিন্ন পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের জন্য স্থাপন করা হয় আধুনিক কোল্ড চেম্বার।
২০২২-২৩ অর্থবছরে কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছে কেন্দ্রটি হস্তান্তর করে। কিন্তু নির্মাণ ও হস্তান্তরের কয়েক বছর পার হলেও এখনো শুরু হয়নি কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রটির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। ভেতরে কোনো কার্যক্রম নেই। চারপাশে নীরবতা। নিরাপত্তার জন্য পাহারাদার থাকার কথা থাকলেও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি।
কেন্দ্রের ভেতরে রাখা সারি সারি আধুনিক ও ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে এসব যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে সমাজসেবক ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাজারহাট উপজেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ডাঃ এম. এ. মোনাইম খাঁ (মোন্নাফ) বলেন, “কৃষকদের সুবিধার জন্য এত বড় একটি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে এটি বন্ধ রয়েছে। ভেতরে দামি মেশিনপত্র পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হলে এসব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত কেন্দ্রটি চালু করে কৃষকদের কাজে লাগানো প্রয়োজন।”
স্থানীয় কৃষকরা জানান, কেন্দ্রটি চালু হলে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি হতো। বিশেষ করে মাছ, মাংস, দুধ ও অন্যান্য পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে লোকসান কমানো সম্ভব হতো।
তাঁদের মতে, মৌসুমে উৎপাদিত পণ্য কম দামে বিক্রি করার পরিবর্তে সংরক্ষণ করে সুবিধাজনক সময়ে বাজারজাত করা যেত। এতে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি পণ্যের অপচয়ও কমত।
তবে এত বড় একটি অবকাঠামো নির্মাণের পরও কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় হতাশ স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল।
কেন্দ্রটি চালু না হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা এস এম শওকত আলম জানান, কেন্দ্রটি তাঁদের মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হলেও প্রকল্পটি সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত তথ্য জানা নেই।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির সভাপতি তানজিলা তাসনিম বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে রংপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) পরিচালক জাহেদুল হক চৌধুরী জানান, পূর্বের নীতিমালা অনুযায়ী আরডিএর নিজস্ব জনবল দিয়ে কেন্দ্রটি পরিচালনার কথা ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের কারণে কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, বর্তমানে নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। টেন্ডারের মাধ্যমে কোনো সমবায় সমিতি, এনজিও বা আগ্রহী উদ্যোক্তার কাছে তিন বছরের জন্য কেন্দ্রটি লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
তবে কবে নাগাদ কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে কৃষকদের কল্যাণে নেওয়া এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
তাঁদের দাবি, দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু করা হোক। কৃষকদের জন্য নির্মিত এই আধুনিক কেন্দ্রটি চালু হলে রাজারহাটসহ আশপাশের এলাকার কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের নতুন সুযোগ পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাফিজুর রহমান
রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:
