বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আজ বাংলা চলচ্চিত্রের এক শক্তিমান অভিনেত্রী সুলতা চৌধুরী'র মৃত্যুবার্ষিকী

আজ বাংলা চলচ্চিত্রের এক শক্তিমান অভিনেত্রী সুলতা চৌধুরী'র মৃত্যুবার্ষিকী

আজ বাংলা চলচ্চিত্রের এক শক্তিমান অভিনেত্রী সুলতা চৌধুরী'র মৃত্যুবার্ষিকী

বাংলা চলচ্চিত্রের ষাট, সত্তর ও আশির দশকের অন্যতম পরিচিত অভিনেত্রী সুলতা চৌধুরী ছিলেন শক্তিশালী অভিনয়, স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব এবং সাবলীল সংলাপ উপস্থাপনের জন্য স্মরণীয় এক শিল্পী। নায়িকা থেকে চরিত্রাভিনেত্রী—বিভিন্ন ধরনের ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি বাংলা সিনেমায় নিজের একটি আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ থিয়েটার অভিনেত্রী। বিশেষ করে উৎপল দত্তের Little Theatre Group (LTG)-এর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁর অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

 

সুলতা চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৫ সালে কলকাতায়। তাঁর জন্মনাম ছিল মায়া রায়চৌধুরী এবং তাঁর বাবার নাম অটলচন্দ্র রায়চৌধুরী। ছোটবেলা থেকেই নাচ, গান ও অভিনয়ের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিই তাঁর আকর্ষণ ছিল বেশি। নৃত্যের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তাঁকে শৈশবেই শিল্পের জগতে নিয়ে আসে। তিনি প্রখ্যাত নৃত্যগুরু রামনারায়ণ মিশ্রের কাছে নৃত্যের তালিম নিয়েছিলেন।

 

কলকাতার Oriental Seminary-তে তিনি পড়াশোনা করেন। কিন্তু অভিনয় ও নৃত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের কারণে প্রচলিত শিক্ষাজীবন খুব বেশি দূর এগোয়নি।


চলচ্চিত্রে আগমন
১৯৬০ সালে ‘দেবর্ষি নারদের সংসার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুলতা চৌধুরীর রূপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে। একই বছরে সুধীর মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবিতে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করে তিনি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। ছবিটি সাফল্য অর্জন করেছিল এবং তাঁর অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করে।

 

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
ক্রমে বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় ও ব্যস্ত অভিনেত্রীদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি। কখনো নায়িকা, কখনো গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্র, আবার কখনো মায়ের ভূমিকায়—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে তিনি নিজের অভিনয়ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন।


থিয়েটারেও উজ্জ্বল উপস্থিতি
সুলতা চৌধুরীর শিল্পীজীবন শুধু চলচ্চিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মঞ্চনাটকেও অভিনয় করেছেন এবং প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের Little Theatre Group-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মঞ্চের অভিনয় তাঁকে চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতে এবং সংলাপ ও শরীরী অভিব্যক্তিকে আরও শক্তিশালীভাবে ব্যবহার করতে সাহায্য করেছিল। তাঁর অভিনয়ে তাই চলচ্চিত্রের পাশাপাশি থিয়েটারেরও গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।


উত্তমকুমারের সঙ্গে অভিনয়
সুলতা চৌধুরী বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমারের সঙ্গেও একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়—
দুই ভাই (১৯৬১)
দাদাঠাকুর
ত্রিধারা (১৯৬৩)
নতুন তীর্থ (১৯৬৪)
তিন ভুবনের পারে (১৯৬৯)
স্ত্রী (১৯৭২)
রৌদ্রছায়া (১৯৭৩)
মৌচাক (১৯৭৪)
ফুলেশ্বরী (১৯৭৪)
বাঘবন্দী খেলা (১৯৭৫)
সন্ন্যাসী রাজা (১৯৭৫)
অগ্নীশ্বর (১৯৭৫)
সব্যসাচী (১৯৭৭)
দাদার কীর্তি (১৯৮০)
সুবর্ণ গোলক (১৯৮১)
দেবিকা (১৯৮৭)
ফুলেশ্বরী, সব্যসাচী, মৌচাক এবং দাদার কীর্তিসহ একাধিক ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয়।


সত্যজিৎ রায়ের ছবির সুযোগ
সুলতা চৌধুরীর অভিনয়জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অথচ তুলনামূলক কম আলোচিত ঘটনা হলো—সত্যজিৎ রায় তাঁকে মহানগর চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু চুক্তিগত জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি সেই চরিত্রে অভিনয় করতে পারেননি।
এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, তৎকালীন বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়ক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা কতটা ছিল।

 

নায়িকা থেকে শক্তিমান চরিত্রাভিনেত্রী
সুলতা চৌধুরীর অভিনয়জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা।
কখনো তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত তরুণী, কখনো সংসারী নারী, কখনো কঠোর ব্যক্তিত্বের অধিকারী চরিত্র, আবার কখনো মমতাময়ী বা হাস্যরসাত্মক চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন।
তাঁর অভিনয়ে অতিরঞ্জন কম, অথচ চরিত্রের আবেগ ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পেত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে। এই কারণেই নায়িকার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ধীরে ধীরে চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে আরও বেশি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেন।

 

চলচ্চিত্রজীবনের শেষ অধ্যায়
প্রায় তিন দশক ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে কাজ করার পর ১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দেবিকা’ তাঁর অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তাঁর অভিনয়জীবনের ব্যাপ্তি ছিল প্রায় ১৯৬০ থেকে ১৯৮৭—একটি সময়, যখন বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম-সুচিত্রা পরবর্তী সময়ের পাশাপাশি বহু শক্তিমান চরিত্রাভিনেতা নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করছিলেন।

 

ব্যক্তিজীবন
ব্যক্তিজীবনে সুলতা চৌধুরী সদানন্দ চক্রবর্তী-র সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের একটি কন্যাসন্তান ছিল।
তবে তাঁর ব্যক্তিজীবনের চেয়ে শিল্পীজীবনের সাফল্যই আজ বেশি আলোচিত—কারণ বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি যে অভিনয়ের ছাপ রেখে গেছেন, সেটিই তাঁকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে।


প্রয়াণ
১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ সালে, ৫২ বছর বয়সে সুলতা চৌধুরীর জীবনাবসান ঘটে।
তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র হারায় এমন এক শিল্পীকে, যিনি নায়ক-নায়িকার প্রচলিত তারকাখ্যাতির বাইরে গিয়ে নিজের অভিনয়প্রতিভা দিয়ে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন।


স্মৃতিতে সুলতা চৌধুরী
সুলতা চৌধুরী হয়তো আজকের প্রজন্মের কাছে খুব পরিচিত নাম নন। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।
‘দুই ভাই’, ‘দাদাঠাকুর’, ‘তিন ভুবনের পারে’, ‘মৌচাক’, ‘ফুলেশ্বরী’, ‘বাঘবন্দী খেলা’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘সব্যসাচী’, ‘দাদার কীর্তি’ কিংবা ‘দেবিকা’—তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের তালিকা বাংলা সিনেমার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কে ধারণ করে।


তিনি ছিলেন সেই সময়ের একজন শিল্পী, যাঁরা প্রমাণ করেছিলেন—একজন অভিনেত্রীর পরিচয় শুধু নায়িকার ভূমিকায় সীমাবদ্ধ নয়; একজন শক্তিমান চরিত্রাভিনেত্রীও একটি চলচ্চিত্রের স্মরণীয় অংশ হয়ে উঠতে পারেন।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর অবদান তাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।

বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা