শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

নিকলীতে ১০ বছর পর ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ, ঘোড়াউত্রা নদীতে জনতার ঢল

নিকলীতে ১০ বছর পর ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ, ঘোড়াউত্রা নদীতে জনতার ঢল

নিকলীতে ১০ বছর পর ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ, ঘোড়াউত্রা নদীতে জনতার ঢল

প্রায় এক দশক পর আবারও বৈঠার ছন্দ, ঢোলের বাদ্য আর হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখরিত হলো কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা নিকলী। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মেঘনা নদীর শাখা ঘোড়াউত্রা নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে নিকলীর ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা।

শত শত বছরের পুরোনো এই নৌকা বাইচকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল নামে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে পরিণত হয় মিলনমেলায়। সম্মিলিত নাগরিক সমাজের ব্যানারে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় মোট ১০টি নৌকা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মানিক মিয়ার সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। বিশেষ অতিথি ছিলেন নিকলীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম আরা, উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোকারম সর্দার, হাজী মাশুকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

প্রতিযোগিতায় মোহরকোনা প্রথম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া দ্বিতীয় এবং সরাইল এক্সপ্রেস তৃতীয় স্থান অর্জন করে। বিজয়ীদের প্রতিনিধিদের হাতে পুরস্কার হিসেবে মোটরসাইকেল, ফ্রিজ ও টেলিভিশন তুলে দেন অতিথিরা। এ ছাড়া অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দলকেও সান্ত্বনা পুরস্কার দেওয়া হয়।

লোককথায় প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্য

স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, নিকলীর এই নৌকা বাইচের ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো। তবে এর সুনির্দিষ্ট শুরুর সময়কাল নিয়ে নির্ভরযোগ্য লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় না।

জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় পাঁচশ বছর আগে নিকলী উপজেলার সোয়াইজনী নদীর তীরে গোবিন্দপুর এলাকায় চন্দ্রনাথ গোস্বামী একটি সুরম্য আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। কোনো এক ভাদ্র মাসের প্রথম দিনে সেই ঘাটে জল নিতে আসেন মনুষা দেবী। তাঁর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হাওরে মাছ শিকার করা দুই যুবক নৌকা ভিড়িয়ে তাঁকে প্রেম নিবেদন করেন।

দুই যুবকের নির্মল প্রেমে মুগ্ধ হন দেবীও। কিন্তু মানুষ ও দেবীর অসম প্রেমের পরিণতি সম্ভব নয়—এ কারণে দুই প্রেমিকের বিরহকষ্ট লাঘবে তিনি তাদের মধ্যে নৌকা বাইচের আয়োজনের প্রস্তাব দেন বলে প্রচলিত আছে।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিশেষ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত লাল গোসাইর আখড়া থেকে বাইচের স্থান নির্ধারণ করা হয়। প্রতিযোগিতায় দুই যুবকের নৌকাই একই সময়ে ঘাটে পৌঁছায়। দুজনের সঙ্গে একসঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সম্ভব না হওয়ায় দেবী নিজেকে দায়মুক্ত করেন এবং দুই যুবকের নির্মল ভালোবাসার স্মৃতি ধরে রাখতে প্রতিবছর ভাদ্রের প্রথম দিনে নৌকা বাইচ আয়োজনের নির্দেশ দিয়ে যান—এমনটাই স্থানীয় লোককথায় বলা হয়।

এরপর থেকে সোয়াইজনী নদীতে লাল গোসাইর আখড়া থেকে চন্দ্রনাথ গোসাইর আখড়া পর্যন্ত নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। সময়ের সঙ্গে এটি হাওরাঞ্চলের অন্যতম বড় লোকজ উৎসবে পরিণত হয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ এতে অংশ নিতেন। নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে আত্মীয়-স্বজন ও জামাইদের নিমন্ত্রণ, পিঠা-পুলি, ঘাটু গান, জারি-সারি গানসহ গড়ে উঠেছিল নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতি।

স্থানীয়রা জানান, কালের বিবর্তনে সোয়াইজনী নদী নাব্যতা হারানোয় নৌকা বাইচের স্থান পরিবর্তন করে ঘোড়াউত্রা নদীতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আর্থসামাজিক ও স্থানীয় বাস্তবতার কারণে ঐতিহ্যবাহী আয়োজনটির তারিখেও পরিবর্তন এসেছে।

দীর্ঘ ১০ বছর পর নৌকা বাইচের আয়োজন হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে নিকলীর হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

 


বদরুজ্জামান ভূঁইয়া সোহাগ 
হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি।