শাহ আমানত মিঠু মহম্মদপুর মাগুরা প্রতিনিধি
মাগুরার মহম্মদপুরে মধুমতি নদীর বুকে অনুষ্ঠিত হলো শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা। নদীর দুই তীরে লাখো মানুষের সমাগম, ঢাকঢোলের শব্দ আর বাইচালদের ‘হেইওরে, হেইওরে’ ধ্বনিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে কয়েক জেলা থেকে আসা মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের ঝামা ঘাট ও আশপাশের এলাকা।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেলে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের মধুমতি নদীর ঝামা ঘাটে এ ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১২০ বছর ধরে প্রতিবছর দুর্গাপূজার বিসর্জনের পরদিন ঝামা ঘাটে এ নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই উৎসব এখন এ অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও আনন্দের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই নৌকাবাইচ দেখতে মধুমতি নদীর দুই তীরে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ। শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠদের উপস্থিতিতে নদীর পাড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নৌকার বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর বাইচালদের সম্মিলিত ‘হেইওরে, হেইওরে’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে নদীর চারপাশ। প্রিয় দলকে উৎসাহ দিতে দর্শকদের উচ্ছ্বাসে জমে ওঠে নৌকাবাইচের প্রতিযোগিতা।
এবারের প্রতিযোগিতায় সাতটি নৌকা অংশ নেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই শেষে প্রথম স্থান অধিকার করে হরেকৃষ্ণপুরের আতিকের নৌকা। দ্বিতীয় হয় একই গ্রামের লালটুর নৌকা এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করে বানা গ্রামের মমিনুর রহমানের নৌকা।
নৌকাবাইচের পাশাপাশি বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা। মেলায় মাছ-মাংস, মিষ্টি, চানাচুরসহ নানা খাবারের দোকান, গ্রামীণ পণ্য, শিশুদের মাটির খেলনা, নারীদের প্রসাধনসামগ্রী এবং নাগরদোলাসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজন ছিল। সুদৃশ্য তোরণ ও বাহারি দোকানে সাজানো মেলাপ্রাঙ্গণে কেনাকাটা ও আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন দর্শনার্থীরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতিবছর এ মেলাকে কেন্দ্র করে কেনাবেচা বেড়ে যায়। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিক্রেতারা আর্থিকভাবে লাভবান হন এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি আসে। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য জমজমাট হয়ে ওঠে।
আয়োজকদের উদ্যোগ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতায় এবারের মেলাও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তাঁদের মতে, শতবর্ষের বেশি সময় ধরে চলে আসা এ আয়োজন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সামাজিক সম্প্রীতি ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। ঐতিহ্যটি ধরে রাখতে তাঁরা সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ উপভোগ করেন এবং পরে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
এ সময় তিনি বলেন, শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এ ঐতিহ্যবাহী মেলা এলাকার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করবে। সরকার দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টি-কালচারকে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলো আরও বেশি আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
মধুমতি নদীর বুকে নৌকাবাইচ, দুই তীরে মানুষের উচ্ছ্বাস আর গ্রামীণ মেলার প্রাণবন্ত পরিবেশে দিনটি পরিণত হয় এক আনন্দঘন উৎসবে। শতবর্ষের এই ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের জন্যও ধরে রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও আয়োজকেরা।