বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের মতোই তরুণ কুমারও মানবিক টানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায়।
তিনি নিয়মিত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন, ওষুধপত্র পাঠাতেন দর্শনা সীমান্তে। সঙ্গে নিতেন ডাক্তার, পৌঁছে দিতেন জীবনরক্ষাকারী সামগ্রী।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল নিঃস্বার্থ ও অগাধ ভালোবাসার।
একাত্তরের সেই দিনগুলো তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত ভুলতে পারেননি।
স্মৃতিতে জেগে থাকত কলিম শরাফী, জহির রায়হান, বেবি ইসলাম, সুভাষ দত্ত, আনোয়ার হোসেন, আলমগীর কবিরদের কথা — বাংলাদেশের বন্ধুদের মুখ।
১৯৩১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্ম তরুণ কুমারের।
বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ‘মেট্রো’ সিনেমা হলের অপারেটর, মা চপলা দেবী গৃহবধূ।
তাঁদের আদি নিবাস বাংলাদেশের যশোরে — সেখান থেকেই পরবর্তীতে পরিবারটি কলকাতায় বসতি গড়ে।
তরুণ কুমার ছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমারের ছোট ভাই, ডাক নাম ছিল “বুড়ো”।
তাঁর শ্বশুরবাড়ি ছিল বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলায়।
নাট্যকার তুলসী লাহিড়ির ‘নতুন প্রভাত’ নাটকে ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন তরুণ।
সেখানেই চলচ্চিত্র পরিচালক অর্ধেন্দু সেন তাঁকে পছন্দ করেন এবং উত্তম কুমার অভিনীত ‘হ্রদ’ (১৯৫৫) ছবিতে দেন প্রথম সুযোগ।
এরপর একের পর এক ছবিতে তিনি নিজস্ব অভিনয়শৈলীতে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
দাদা উত্তম কুমারের পাশে থেকেও তিনি নিজের অভিনয়সত্তাকে আলাদা উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।
উত্তম কুমার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন —
“দু’জনের সঙ্গে অভিনয় করতে গেলে আমাকে সতর্ক থাকতে হয় — একজন সাবু (সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়) আর একজন আমার ভাই বুড়ো। এরা আমার চেয়েও বড় অভিনেতা!”
তরুণ কুমার প্রায় ৬০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে —
দেয়া নেয়া, দায় দায়িত্ব, মনের মতো মন, জীবন সন্ধান, দামু, সংঘর্ষ, নবাব, রক্তঋণ, মহাপীঠ তারাপীঠ, তুমি কত সুন্দর, প্রতিদান, রাজপুরুষ, স্বর্ণময়ীর ঠিকানা, অঘটন আজও ঘটে, নীলিমায় নীল, ইত্যাদি অসংখ্য কালজয়ী চলচ্চিত্র।
উত্তম কুমারের আগেই তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন ‘দাদা ঠাকুর’ ছবির জন্য — যা ছিল তাঁর অভিনয়প্রতিভার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।
ষাটের দশকে সহ-অভিনেত্রী সুব্রতা সেন-কে ভালোবেসে বিয়ে করেন তরুণ কুমার।
দাদা উত্তম কুমারের সহায়তাতেই আনুষ্ঠানিকভাবে হয় তাঁদের বিবাহ।
তরুণ–সুব্রতা ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের রিল ও রিয়েল—দুই জগতের আদর্শ দম্পতি।
রূপালি পর্দার পাশাপাশি পেশাদার মঞ্চনাট্যেও ছিলেন দাপুটে অভিনেতা।
‘ক্ষুধা’, ‘সেতু’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘আসামী হাজির’, ‘নহবত’, ‘নাগপাশ’ প্রভৃতি নাটকে দর্শক মাতিয়েছেন।
দাদার স্মৃতিতে গড়েছিলেন ‘উত্তম মঞ্চ’, যেখানে তিনি শেষ বয়সেও অভিনয় করতেন ‘মরেও শান্তি নেই’ নাটকে।
বিশ্বরূপায় ‘আসামি হাজির’ নাটকে হুইলচেয়ারে বসে বয়স্ক চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও থিয়েটারপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে।
২০০৩ সালে কিডনি ও লিভারের জটিল অসুখে ভুগতে থাকেন তরুণ কুমার।
স্ত্রী সুব্রতা তখনও অসুস্থ ছিলেন।
সবাই ভেবেছিলেন সুব্রতাই আগে হার মানবেন, কিন্তু ২০০৩ সালের ২৭ অক্টোবর হেপাটাইটিক কোমায় প্রয়াত হন এই কিংবদন্তি অভিনেতা।
তাঁর প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র হারায় এক মেধাবী, মানবিক ও সংবেদনশীল শিল্পীকে —
যিনি শুধু সিনেমায় নন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
শ্রদ্ধাঞ্জলি তরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়কে —
অভিনয়ে, মানবতায় ও শেকড়ের টানে যিনি চিরঅমলিন।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা
-1793094315.jpg)