শ্রীপুর(গাজীপুর)প্রতিনিধি: বিবেকের তাড়নায় প্রায় অর্ধশতাব্দী পর টিকিটবিহীন ট্রেন ভ্রমণের ‘বকেয়া’ শোধ করে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম (৬০)। বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বিশেষ রশিদের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা জমা দিয়ে তিনি নিজের দায়মুক্তি নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে কিশোর বয়সে কাঁঠালের ব্যবসার কারণে নিয়মিত ট্রেনে শ্রীপুর থেকে ঢাকায় যাতায়াত করতেন মফিজুল ইসলাম। সে সময় তিনি টিকিট ছাড়াই ট্রেনের ছাদে চড়ে ভ্রমণ করতেন। মাঝে মধ্যে দায় এড়াতে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের কিছু অর্থ দিলেও বিষয়টি তার মনে দীর্ঘদিন অপরাধবোধ হিসেবে রয়ে যায়।
মফিজুল ইসলাম বলেন, “তখন ইচ্ছে থাকলেও টিকিট কাটতে পারিনি। ব্যবসার প্রয়োজনে ঢাকায় যাওয়া জরুরি ছিল। পুলিশের হাতে কিছু টাকা দিলেও রেলওয়ের কাছে দেনা থেকেই গেছে।”
দীর্ঘদিনের সেই অপরাধবোধ থেকেই সম্প্রতি বকেয়া পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তিনি বলেন, “এখন বয়স হয়েছে। মনে হলো, বিষয়টি আর ফেলে রাখা ঠিক নয়। নিজের কাছে দায়বদ্ধতা থেকেই দ্রুত পরিশোধ করেছি।”
এ উদ্দেশ্যে তিনি শ্রীপুর রেলস্টেশনে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে সহকারী স্টেশন মাস্টারের পরামর্শে গত ২৮ মার্চ বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্ধারিত কোডের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে ২০ হাজার টাকা জমা দেন, যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যুক্ত হয়।
শ্রীপুর রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার সাইদুর রহমান জানান, রেলওয়েতে পুরোনো বকেয়া বা টিকিটবিহীন ভ্রমণের অর্থ স্বেচ্ছায় পরিশোধের একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি বলেন, “নিজের ভুল স্বীকার করে তা শোধ করার এমন উদ্যোগ সত্যিই বিরল ও প্রশংসনীয়।”
টাকার পরিমাণ নির্ধারণ প্রসঙ্গে মফিজুল ইসলাম বলেন, “আমি ধারণা করেছি, কম হতে পারে। তবে বেশি দিলেই দায়মুক্তি নিশ্চিত হবে—এই ভাবনা থেকেই ২০ হাজার টাকা দিয়েছি।”
অর্থ জমা দেওয়ার পর নিজের অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, “এখন নিজেকে অনেক হালকা লাগছে।”
বর্তমানে মফিজুল ইসলাম ‘ব্যাপারীবাড়ি ফাতেমাতুয যাহেরা মহিলা মাদ্রাসা’র প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অতীতে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের কাছেও বকেয়া থাকা অর্থ তিনি পরিশোধ করেছেন বলে জানান।
তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পড়েছে। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আগে যারা এমন করেছে, তাদের উচিত বকেয়া পরিশোধ করা। আর এখনকার তরুণরা সচেতন—তারা এমন ভুল করবে না।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, মফিজুল ইসলামের এই উদ্যোগ সততা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।