বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

বাজেটে সাশ্রয় নাকি সৃজনশীলতার সংকট

বাজেটে সাশ্রয় নাকি সৃজনশীলতার সংকট

বাজেটে সাশ্রয় নাকি সৃজনশীলতার সংকট

বাংলাদেশের নাট্য ও অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রযোজনা শিল্পে সাম্প্রতিক সময়ে এক নতুন পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে গান তৈরি করে নাটকে ব্যবহার করার প্রবণতা। আগে যেখানে একটি গান তৈরি করতে গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং শিল্পীর জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হতো, এখন সেখানে এআই প্রযুক্তি সেই ব্যয়ের বড় অংশই প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। এতে করে নাটকে খুব সহজেই গান ব্যবহার করা যাচ্ছে। কিন্তু এটা কী নাটকের বাজেটে খরচ কমানোর বিপ্লব, নাকি সৃজনশীলতার নতুন সংকট? বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।

নাটকে এখন হরহামেশাই গানের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। তার বেশির ভাগই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা এআই জেনারেটেড। লিরিকস বসিয়ে কিছু প্রমট দিলেই বিভিন্ন এআই অ্যাপস গান তৈরি করে দিচ্ছে এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে। গান লিখতে না পারলেও সমস্যা নেই। কী ধরনের গান চাই, সেটা বললেই এআই তাও লিখে দিচ্ছে। শুধু নিজের মতো করে এডিট করে দিলেই হলো। সুর, সংগীত তৈরির কাজ এআই করে দেয়। প্রযোজনা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ অডিও গান তৈরি করতে বর্তমানে গড়ে ১ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। বড় তারকা শিল্পীদের ক্ষেত্রে এ ব্যয় আরও কয়েকগুণ বাড়ে। ফলে নাটকের মোট বাজেটেও চাপ পড়ে। বিশেষ করে টেলিভিশন ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে প্রযোজকদের জন্য খরচ নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে এআইনির্ভর গান একটি বিকল্প সমাধান হিসাবে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এআই গান কীভাবে পরিবর্তন আনছে নাট্য প্রযোজনায়? এআই মিউজিক জেনারেশন টুল ব্যবহার করে এখন কয়েক মিনিটেই সম্পূর্ণ গান তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যেখানে কণ্ঠ, সুর, এমনকি মিক্সিং ও মাস্টারিংও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়। নাটকের গল্প অনুযায়ী নির্দিষ্ট মুড (ওরামান্টিক, ট্র্যাজেডি, থ্রিলার) সেট করে দিলে সফটওয়্যার সেই অনুযায়ী গান তৈরি করে দেয়। ঢাকার এক নাট্য প্রযোজক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘আগে যেখানে একটি নাটকের জন্য আলাদা গান বানাতে ২-৩ লাখ টাকা লাগত, এখন এআই ব্যবহার করে সেই কাজ প্রায় বিনামূল্যে করা যাচ্ছে। ফলে বাজেট অনেকটা কমে গেছে।’ এই কারণে অনেক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নাটকের পাশাপাশি সেই এআই-তৈরি গান আলাদাভাবে মিউজিক ভিডিও আকারেও প্রকাশ করছে, যা ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই সংগীত ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো খরচ হ্রাস এবং দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা। যেখানে আগে লাখ টাকার বাজেট প্রয়োজন হতো, সেখানে এখন প্রায় শূন্য খরচে গান তৈরি করা যাচ্ছে। একইসঙ্গে হচ্ছে সময়ের সাশ্রয়। একটি গান তৈরি করতে যেখানে আগে কয়েকদিন বা সপ্তাহ লাগত, এখন কয়েক মিনিটেই সেটি প্রস্তুত করা সম্ভব। আরও সুবিধা হচ্ছে একই নাটকের বিভিন্ন দৃশ্যের জন্য একাধিক ভার্সনের গান তৈরি করা যায়। ফলে ছোট বাজেটের প্রযোজকরাও এখন নাটকে গান ব্যবহার করতে পারছেন, যা আগে সম্ভব ছিল না।

তবে এই পরিবর্তনের বিপরীতে বড় একটি প্রশ্নও উঠছে, এআই কি মানুষের সৃজনশীলতাকে প্রতিস্থাপন করছে? সংগীতশিল্পীদের মতে, গান শুধু সুর বা কম্পোজিশন নয়; এর সঙ্গে জড়িত আবেগ, অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক অনুভূতি। এআই সেই মানবিক আবেগ পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে সংগীতশিল্পী ধ্রুব গুহ বলেন, ‘এআই গান তৈরি করতে পারে, কিন্তু অনুভব তৈরি করতে পারে না। একটি প্রেমের গান যখন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আসে, তার গভীরতা আলাদা।’ এ ছাড়া গীতিকার ও সুরকারদের মধ্যে কর্মসংস্থান হারানোর শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। কারণ প্রযোজকরা যদি এআই-এর দিকে ঝুঁকে যান, তাহলে মানব সৃষ্টিশীল কর্মীদের চাহিদা কমে যেতে পারে।

নাটকে গান ব্যবহারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো কপিরাইট। প্রচলিতভাবে একটি গানের গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর অধিকার আলাদা আলাদা থাকে। ফলে প্রযোজকরা গান ব্যবহার করলেও তার পূর্ণ মালিকানা পান না। এআই-জেনারেটেড গান এ সমস্যার কিছুটা সমাধান করছে বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব গানের মালিকানা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নিজেদের নামে রাখতে পারছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ক্ষেত্রটি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এ প্রসঙ্গে কপিরাইট নিয়ে কাজ করা সংগীতশিল্পী জুয়েল মোর্শেদ বলেন, ‘এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টের মালিকানা কার হবে, এটি এখনো অনেক দেশে বিতর্কিত বিষয়। বাংলাদেশেও এ বিষয়ে স্পষ্ট আইনগত কাঠামো প্রয়োজন।’ আরেকটি বিষয় হলো, যদিও এআই গান দ্রুত তৈরি করা যায়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এর গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে নাটকের আবেগপূর্ণ দৃশ্যে এআই সংগীত সবসময় যথাযথ গভীরতা আনতে পারে না বলে সমালোচনা রয়েছে। নাটকের দর্শকদের একটি অংশ মনে করেন, এআই গান অনেক সময় ‘যান্ত্রিক’ শোনায়। এতে নাটকের আবেগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এআই সংগীত সম্পূর্ণভাবে মানব শিল্পীদের প্রতিস্থাপন করবে না, বরং সহকারী হিসাবে কাজ করবে। অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত কনটেন্ট তৈরির জন্য এআই ব্যবহার করা যাবে, আর গুরুত্বপূর্ণ গানগুলো মানব শিল্পীরাই তৈরি করবেন। একই সুর ধ্রুব গুহর মুখেও। তিনি বলেন, ‘এটি প্রতিস্থাপন নয়, বরং সহাবস্থান হতে পারে। প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতা একসঙ্গে কাজ করবে।’

তবে এটা ঠিক, নাটকে এআই-তৈরি গানের ব্যবহার বাংলাদেশের বিনোদন শিল্পে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এটি একদিকে যেমন খরচ কমিয়ে প্রযোজকদের জন্য সুবিধা বয়ে আনছে, তেমনি অন্যদিকে সৃজনশীলতা, কর্মসংস্থান ও কপিরাইট নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। এআই জেনারেটেড গান এখন এক ‘ডাবল-এজড সোর্ড’ যার সঠিক ব্যবহার ভবিষ্যতের নাট্যশিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে, আবার ভুল ব্যবহারে এটি মানব সৃজনশীলতার জায়গাকেও সংকুচিত করতে পারে।