মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকের এক গৌরবময় নাম মিতা চৌধুরী, যিনি সত্তর ও আশির দশকে ছিলেন নাট্যাঙ্গনের উজ্জ্বলতম তারকা। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন রেডিওর সংবাদপাঠক, বিটিভির অনুষ্ঠান উপস্থাপক এবং একজন সূক্ষ্ম সংবেদনশীল শিল্পী। কখনও দৃপ্ত কণ্ঠের জাঁদরেল চরিত্রে, আবার কখনও গভীর আবেগময় নাট্যপ্রয়োগে তিনি দর্শকের হৃদয় ছুঁয়েছেন।
পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় জন্ম নেওয়া মিতার পুরো নাম ছিল মিতা রহমান। বাবার নাম আমিনুল হক চৌধুরী – বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্ভনর, এবং মা নূর-ই-আক্তার বানু একজন গৃহিণী।
তিনি সেন্ট ফ্রান্সিস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও হলি ক্রস গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৭৫ সালে এইচএসসিতে মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সম্মিলিত মেধাতালিকায় অষ্টম স্থান অর্জন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেন।
দশম শ্রেণিতে পড়াকালেই অভিনয়ের হাতেখড়ি হয় তাঁর। আতিকুল হক চৌধুরীর নাটক ‘আরেকটি শহর চাই’ ছিল তাঁর প্রথম টিভি নাটক। এরপর 'শান্ত কুটির' নামে প্রথম ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন।
‘বরফ গলা নদী’ নাটকের 'লিলি' চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে এনে দেয় আলাদা পরিচিতি। ‘নন্দিত নরকে’ ছিল তাঁর আরেকটি স্মরণীয় নাটক।
সুবর্ণা মুস্তাফা প্রথম টিভি নাটকে মিতার সঙ্গেই ‘বরফ গলা নদী’-তে অভিনয় করেন।
শুধু ছোট পর্দা নয়, মঞ্চেও তাঁর ছিল দাপুটে উপস্থিতি। ‘সূচনা’ ও ‘গুড নাইট মা’-এর মতো নাটকে তিনি দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। ‘গুড নাইট মা’ নাটকের পাণ্ডুলিপি তিনি নিজেই তৈরি করেছিলেন মার্কিন নাট্যকার মারশা নরম্যানের ‘নাইট মাদার’ অবলম্বনে।
দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকলেও নাটকের টানে ২০০৬ সালে দেশে ফিরে প্রায় এক দশক নাট্যাঙ্গনে কাজ করেন। সে সময় ‘ডলস হাউস’, ‘যোগ-বিয়োগ’ প্রভৃতি নাটকে তাঁকে দেখা যায়।
পরবর্তীতে তিনি লন্ডনে ফিরে যান এবং সেখানেই শেষ হয় তাঁর জীবনযাত্রা।
চলচ্চিত্রেও রেখেছেন নিজের স্বাক্ষর। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো:
বিষ, আন্ডার কনস্ট্রাকশন, মেড ইন বাংলাদেশ
ব্যক্তিজীবনে তাঁর দুটি সন্তান রয়েছে। স্বামী শহীদুর রহমান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০২২ সালের অক্টোবরে মৃত্যুবরণ করেন।
মাত্র এক বছরের ব্যবধানে, ২০২৩ সালের ২৯ জুন লন্ডনের একটি হাসপাতালে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মিতা চৌধুরী।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এক অনন্য নাট্যপ্রাণ শিল্পীকে।
নাট্যমঞ্চ ও পর্দা তাঁকে ভুলবে না কোনোদিন।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।